১৭ জুলাই, ২০২৬
সন্দেহ
আমার শাশুড়ি খুব সকালে ঘুম থেকে উঠতেন। সাধারণত বৃদ্ধ মহিলারা নামাজ রোজা করেন। কিন্তু আমি তাকে কখনও নামাজ পড়তে দেখি নাই।
তিনি হাঁটতে পারতেন, তবে খুব কমই তার খাট থেকে নামতেন। বেশিরভাগ সময় খাটে বসে থাকতেন, আর হাতে একটা তসবি নিয়ে কী যেন জপতেন।
আমি চেষ্টা করতাম সকাল আটটার মধ্যে ঘুম থেকে উঠে তাঁকে চা দিতে। কখনও দেরি হলে তিনি অদ্ভুত কথাবার্তা বলতেন। যেমন আমার মনে আছে একবার এমন দেরি হল। আমি চা নিয়ে গিয়েছিলাম সাড়ে নয়টার দিকে।
আমার শাশুড়ি বললেন, “বসো বউ।”
আমি বসলাম।
তিনি বললেন, “তুমি কি তবারকরে চিন?”
—কোন্ তবারক মা? —ওই যে তবারক আলি, তোমার জামাই মানে আমার পোলার লগে পড়ত যে জামাল তার চাচা। —না মা, উনারে চিনি না। —সেই তবারক আলি যখন বিয়া করে, ফ্যামিলির কথা শুনে নাই। বিয়া করছিল চামারের মাইয়া। চামার চিন তো? জুতা সিলাই করে যে চামার, আমার দাদার রাইয়ত ছিল এইরকম চামারেরা কিছু। —জি। —চামারদের নিয়ম আর আমাদের নিয়ম কি এক হয়? হয় না। ছোটোলোকের বায়ান্ন বাহানা। —জি। —সেই চামারের মাইয়া ঘুম থেকে উঠত এগারোটায়। দেখা যাইত বাড়ির সবাই উইঠা গেছে, কিন্তু চামারের মাইয়া ঘুমে। উনার ঘুম ভাঙে নাই। চুতমারানি মাগি।
এই পর্যন্ত শোনার পর আমি বুঝতে পারছিলাম তিনি কোন্দিকে নিয়ে যাচ্ছেন কথাকে। কিন্তু কিছু বললাম না।
আমার শাশুড়ি বলতে থাকলেন, “হালিমের বিয়ার সময়ে আমরা তো খোঁজখবর নিছিলামই কিছু। আমি তো এইরকম শুনি নাই তোমার পূর্বপুরুষ কেউ চামার ছিল, ছিল নাকি?”
আমি কী উত্তর দিব বুঝতে পারছিলাম না।
তিনি বললেন, “যাও এইখান থেইকা।”
এই একটা উদাহরণ দিলাম। এইরকম কথাবার্তা তিনি বলতেন।
আমার সাথে কথাবার্তায় বাজে আচরণ করে তিনি আনন্দ পেতেন বলেই আমার মনে হত। হয়তো তিনি তাঁর জীবনে তাঁর শাশুড়ির কাছ থেকে এমন আচরণ পেয়েছেন, এবং তাই এখন অবচেতনভাবে একই জিনিস করে যাচ্ছেন, এটা ভেবে আমি নিজেকে সান্ত্বনা দিতাম।
একদিন আমি শুনলাম তিনি আমার স্বামী আবদুল হালিমের সাথে কথা বলছেন।
—বউরে বিশ্বাস করবি না বাপ। বউরে বিশ্বাস করে চামারে। আবদুল হালিম বলে, “এইটা কী বলেন আম্মা? আব্বা কি আপনারে বিশ্বাস করত না?” —না। বিশ্বাস করলে কি সংসার টিকে? তোর বউ তুই কামে চইলা গেলে কী করে জানস তুই? —কী আর করবে। ঘরের কাজ কাম করে। —হ করছিল ঘরের কাম। আমি ঘরে থাকি না? আমি দেখি না? —তাইলে আপনে বলেন কী করে? —আমি বলব না। কেন আপনে বলবেন না? আপনে কি চান না আপনার পোলার সংসার টিইকা যাক? —না। —আজব মা আপনে। চান না কেন? —কারণ আমার চাওয়া না চাওয়ায় কিছু যায় আসে না। আর আমি তো কই, এই মাইয়া তর জন্য ভালো না। তর বিয়াতে আমার মত ছিল না। খারাপ মাইয়া আমি দেখলেই চিনতে পারি। —কিন্তু বিয়া তো হইয়া গেছে আম্মা। আর আপনে যেহেতু ঘরে আছেন, দেখতেছেন সে কী করতেছে, তাইলে আমার আর চিন্তা কী বলেন? —আমি এইগুলা দেখি না। তুই ক্যামেরা লাগাইয়া রাখ। দেখবি সব।
আমি দরজার পাশে দাঁড়িয়ে এসব আলাপ শুনলাম।
পরে আবদুল হালিমকে জিজ্ঞেস করলাম, “এসব কী?”
সে হেসে বলে, “আরে আম্মার মাথা ঠিক নাই। কী না কী বলে, সব ধরলে হবে না।”
জিজ্ঞেস করি, “ক্যামেরা লাগাইবা না?”
সে বলে, “ধুর!”
এরপর আমার শাশুড়ি একদিন আমার সাথেও এসব নিয়ে আলাপ করলেন।
আমাকে বললেন, “বউ, তুমি কি আবদুল হালিমরে বিশ্বাস কর?”
আমি বললাম, “জি করি।”
তিনি বললেন, “পুরুষ মানুষরে বিশ্বাস করবা না। এরা কুত্তার জাত। আবদুল হালিমের রক্তে খারাপি আছে। তার বাপের চরিত্র ভালো ছিল না।”
আমি বললাম, “জি।”
উনি বললেন, “আমি অনেক কথা বলি। কিন্তু এই কথা ফালাইও না। আবদুল হালিমের উপরে চোখ দিয়া রাখবা। চোখ সরাইলেই বিপদ। একবারের ঘটনা তোমারে বলি। আমি বাপের বাড়ি গেছিলাম কয়েকদিনের জন্য। এক রাতে আমার মনে হইল কিছু ঠিক নাই। ওই রাতেই আমি বাড়ি ফিইরা আসি আর আবদুল হালিমের বাপরে পাই আরেকটা মাইয়ার সাথে। বেশি কিছু করতে পারে নাই। তার আগেই আমি চইলা আসি। এইসব জিনিস খুব খিয়াল রাখবা। বাপের বাড়ি গেলেও স্বামীর উপর চোখ রাখবা। চোখ সরাইলেই বিপদ। ক্যামেরা লাগাইয়া রাখবা।”
উনি অনেক আজেবাজে কথা বলেন। তাকে আমার অসহ্য লাগত, কিন্তু তার এই কথাটি, তিনি এমনভাবে বললেন যে, আমার ভেতরে ঢুকে গেল।
এরপর আরও নানা সময়ে তিনি এইসব বিষয়ে আমাকে বলতেন।
একবার বললেন, “একদিন দেখবা তোমার জামাই হাসি খুশি। অফিসে বেশি টাইম দেয়, তার কাজের চাপ বেশি। তার কাছে অফিসের কাজের খালি ফোন আসে। ফোন আসলেই সে গুরুত্বপূর্ণ কথার জন্য ছাদে চইলা যায়। এসব লক্ষণ দেখার আগেই সাবধান হইয়া যাও। জামাই হইল পিছলা হাতে মার্বেল পাথরের মতো, হাত ফসকাইয়া একবার গেলে আর ধরতে পারবা না।”
হুট করেই একদিন ভদ্রমহিলা মারা গেলেন।
তিনি মারা যাবার পরে তাঁর কথাগুলি আমার বেশি মনে হত। আমি দেখতে পাচ্ছিলাম আবদুল হালিম ব্যস্ত হয়ে পড়ছে কাজে। তার কাছে অনেক বেশি ফোন আসে এখন, ইত্যাদি।
আমার ভেতরে সন্দেহ বাড়তে থাকে।
আগে তো আমার শাশুড়ি ছিলেন। ফলে আমি যখন বাপের বাড়িতে গিয়ে কয়েকদিন থাকতাম তখন নিশ্চিন্ত ছিলাম। কিন্তু তিনি যখন নেই তখন কেন জানি আমার মনে এই প্রশ্ন আসতে থাকে, আবদুল হালিম যদি রাতে অন্য কোনো মেয়ে নিয়ে আসে?
এই সন্দেহ বাড়তে থাকলে আমি একটা ক্যামেরা লাগাই আমাদের বেডরুমে। ইন্টারনেটের মাধ্যমে তা স্মার্টফোনের সাথে যুক্ত করা যায়। এবং লাইভ দেখা যায় যে ঘরে কী হচ্ছে।
আমি বাপের বাড়ি গিয়ে যে ক-দিন থাকতাম, রাতে দেখতাম যে আবদুল হালিম কী করছে। কারণ কোনো মেয়ে নিয়ে আসলে অবশ্যই বেডরুমে নিয়ে আসবে।
শাশুড়ি মারা যাবার কয়েক বছর হয়ে গেল। প্রথম প্রথম আমি বাপের বাড়ি গেলে নিয়মিত ক্যামেরা দেখতাম। কিন্তু আবদুল হালিমের নাক ডাকা ঘুম ছাড়া আর কিছু চোখে পড়েনি।
ফলে একসময় এটি দেখা ছেড়ে দেই, একরমক ভুলেই যাই এর কথা।
একজনের মানুষের সাথে দীর্ঘদিন থাকলে তার প্রকৃতি বুঝা যায়। আমার শাশুড়ি যেরকম বলতেন আবদুল হালিম কখনোই তেমন নয়। সে কাজপাগলা লোক। কাজ করে, এবং বাকি সময় ফুটবল খেলার সংশ্লিষ্ট নানা কিছুতে ব্যয় করে ফেলে। অন্যদিকে মন দেবার ইচ্ছা ও সময় কোনোটাই তার নেই।
আমাদের বাচ্চা হচ্ছিল না। এ নিয়ে আমরা চিন্তিত ছিলাম। ডাক্তারের কাছে যাচ্ছিলাম।
গতকালও ডাক্তার ছিল। সেখান থেকে এসেই আবদুল হালিম জরুরি ব্যাবসার কাজে চট্টগ্রামে গিয়েছে। ফিরে আসবে কাল সকালে।
বাসার কাজের মহিলাও আজ ছুটিতে আছে, পরিবারের সাথে দেখা করতে গিয়েছিল।
রাতে আমার ঘুম আসছিল না। ভাবছিলাম যে আবদুল হালিম এখন কী করছে। তখন হঠাৎ মনে পড়লো সেই সন্দেহের কথা। ক্যামেরার কথা।
তখন আমি মোবাইলের ওই অ্যাপটি খুঁজে বের করলাম, যেখানে ক্যামেরা ইন্সটল করা ছিল। ইন্টারনেটের মাধ্যমে কানেক্ট করে আমি দেখতে চাচ্ছিলাম এই রুমে আমি যে আছি, আমাকে কীরকম দেখায় তা দেখতে, কিংবা এখনও কাজ করে কি না ক্যামেরাটি।
অ্যাপে দেখাচ্ছিল আমার রুমের চিত্র। কিন্তু প্রাথমিক দৃশ্য দেখে আমার ভ্রূ কুচকে গেল। বিছানায় বসে আছেন আমার শাশুড়ি। তিনি বসে তসবি জপছেন, ঠিক আগের মতো।
আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিল। এসব আমি কী দেখছি!
আমার শাশুড়ি বিছানা থেকে নামলেন। ঘরে হাঁটাহাঁটি করলেন। এরপর এগিয়ে এলেন ঠিক ক্যামেরার কাছাকাছি।
আমার মনে হচ্ছিল মাত্র কয়েক ইঞ্চি দূরে তিনি। তিনি বললেন, “কেমন আছ বউমা? কতদিন তোমার সাথে কথা বলতে চাইতেছি। তুমি তো দেখ না।”
এরপর আমি শুনলাম কারও পায়ের শব্দ ক্যামেরায়। কে জানি রুমে আসছে।
আমার শাশুড়ি সতর্ক হয়ে উঠলেন। তিনি দ্রুত খাটের নীচে লুকিয়ে গেলেন।
দেখলাম আমি এসে রুমে প্রবেশ করেছি।
আমি বাথরুমে গেলাম। এরপর বিছানায় উঠলাম।
মানে ক্যামেরা কিছু সময় পেছানো। শুরু থেকেই হয়তো এমন ছিল।
কিন্তু আমার খাটের নীচে এখন…
আমার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
খাটের নীচ থেকে যেন আমি শুনতে পাচ্ছি নিশ্বাসের শব্দ। আর খসখসে এক আওয়াজ, “বউমা, আছো কেমন?”
সমাপ্ত