সব গল্প

১৬ জুলাই, ২০২৬

মার্চ করে চলে যাওয়া একদল কাঠবিড়ালি ও খয়েরি ঘাসফড়িং

রোদ পড়ে গেছে। সূর্য এখন আস্তে আস্তে রঙ বদলাবে। তারপর মিলিয়ে যাবে। কাঠবিড়ালিদের সূর্য চন্দ্র ইত্যাদি নিয়ে বোধহয় কোনও আদিখ্যেতা নেই। মানুষের আছে। তেরাব আলী বারান্দায় বসে ভাবেন। ইদানীং তাঁর হাতে নতুন কাজ আসছে না। কাজ না থাকলে তার হাঁসফাঁস লাগে। তখন তিনি কবিতা লেখেন। অথবা গলা পর্যন্ত পানিতে ডুবিয়ে বসে থাকেন বেশিরভাগ সময়।

এসময় কাঠবিড়ালিরা তাঁর চিন্তার অধিকাংশ জুড়ে থাকে। তিনি কাঠবিড়ালি সম্প্রদায়ের সাথে মানুষের মিল খুঁজেন। বেশিরভাগ সময়ে হতাশ হন। তাঁর বারান্দার পাশের লম্বা গাছটিতে কত কটা কাঠবিড়ালি লাফিয়ে বেড়ায়। তাঁকে বারান্দায় বসতে দেখলে চোখ বড় বড় করে চোখের দিকে তাকায়। অথচ তেরাব আলী জানেন মানুষেরা বেশি চোখের দিকে তাকায় না। এর একটা কারন অবশ্য বের করেছেন তিনি। তাঁর ধারণা চোখের শক্তি অপরিসীম। ভালভাবে চোখের দিকে তাকালে একটা মানুষকে পুরো দেখে নেওয়া যায়। মানুষের অবচেতন সত্ত্বা এই জিনিসটা জানে। তাই সে মানুষকে অন্য মানুষের চোখের দিকে তাকাতে বাধা দেয়। পাছে প্রকাশ পেয়ে যায় গত জীবনের পাপ কিছু। মানুষ একটা ভীতু প্রাণী। তেরাব আলী দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন। মানুষ ভীতু প্রাণী এতে তাঁর খুশি হওয়ার কথা। কিন্তু তাঁর খারাপ লাগে। মানুষের উচিত ছিল প্রকৃতিগত ভাবে কাঠবিড়ালিদের মতো সাহসী হওয়া।

চোখ সংশ্লিষ্ট ব্যাপারে তেরাব আলী অনেক সিরিয়াস। তিনি প্রথমেই মানুষের চোখের দিকে তাকান। মানুষ বার বার বিভিন্ন ছুতায় চোখ সরিয়ে নিতে চায়। আর তিনি বারবার চোখ দিয়ে জাপটে ধরেন। এতে তাঁর কাজের সুবিধা।

আজকে তিনি কবিতা লিখবেন ঠিক করলেন। তাঁর কবিতাগুলো অদ্ভুত। তিনি একবার ছাপতে দিয়েছিলেন। পত্রিকাওয়ালা তাকে বলেছিলেন, কী লিখেছেন এসব? এগুলো কোনও মানুষ লিখতে পারে? আপনি কবিতা লিখবেন না প্লিজ। ইচ্ছে হলে মানুষ মারুন। তবু বাংলা কবিতাকে মারবেন না।

বাংলা কবিতার প্রতি দরদবান এই সম্পাদকের প্রতি অবশ্য তাঁর কোনও ক্ষোভ জাগেনি। তার নিজেরও ধারণা ছিল তিনি ছাঁপার মতো কিছু লেখেননি।

তেরাব আলী কবিতা লিখবেন ঠিক করে কাগজ নিয়েছেন, ঠিক সাথে সাথেই তাঁর ফোন বেজে উঠল। পরিচিত নাম্বার। তেরাব আলী কেটে দিলেন। বারান্দা থেকে ঘরে আসলেন। আলনায় ঝোলানো পাঞ্জাবিটা গায়ে জড়ালেন। খাটের নিচ থেকে স্যান্ডেল বের করলেন। বের হলেন ঘর থেকে। আজ ঘরে বসে কবিতা লেখা হবে না। আজকের আকাশ বিষণ্ণ আকাশ। বিষণ্ণ আকাশে একদল কবি বাইরে বের হন।

গলি দিয়ে হাঁটছেন তেরাব আলী। ছোট গলি। পাশে পাশে লোকজন ময়লা ফেলে রেখেছে। তবুও মানুষের ভিড়। মানুষের চোখে মুখে ব্যস্ততা। সবাই ব্যস্ত। তেরাব আলী এখানেও কাঠবিড়ালিদের সাথে মানুষের কোনও মিল পান না। কাঠবিড়ালিরা মানুষের চেয়ে দ্রুত চলে। কিন্তু তাদের চলায় ব্যস্ততা নেই। ছন্দ আছে। এক ধরনের সৌন্দর্য আছে। দেখলে মনে হয় চার্লস বুকোস্কির কবিতা। বুকোস্কি কে কি ঈশ্বর হায়ার করেছিলেন কাঠবিড়ালিদের তৈরি করার সময়? তেরাব আলীর মনে উদ্ভট চিন্তা চলে আসে। তিনি নিজেই অবাক হন। এসব জিনিস আসার কথা না। তবে তিনি কি আসলেই কবি? আসলেই সেই কবিদের একজন যাদের কবিতায় আটকে থাকে বাতাস, সময় এবং কয়েক কোটি মহাবিশ্বের সমান মুগ্ধতা?

আজ মনে হয় বৃষ্টি আসবে। বৃষ্টি ভাল জিনিস। কবিদের জন্যও, তার জন্যও। তিনিই তো কবি। জীবনানন্দের মতো আমিই সেই কবি বলে কোন পঙক্তি হয়ত লেখেননি। কিন্তু তাতে কী! বৃষ্টির শব্দ সব সময়েই কবিদের সাহায্য করে কবিতায়। অমোঘ সত্য পৃথিবীর।

তেরাব আলী গলি পার হয়ে কয়েকটা চায়ের দোকান ফেলে লাইট হাউজ সিডি এ্যান্ড ডিভিডি শপের উলটো দিকে ভাঙা মুরগির ফার্মের পিছনের আধভাঙা দালানটায় গিয়ে ঢুকলেন। এখানে খুব দুর্গন্ধ। মুরগির ফার্মের বেশিরভাগ বর্জ্য ফেলা হয় এদিকটায়।

তেরাব আলী স্বাভাবিকভাবেই গিয়ে ঢুকলেন। গলায় লাল গামছা দেওয়া এক লোক বসে ছিল। তেরাব আলী যেতেই উঠে পড়ে।

“আসছেন বস? কতক্ষণ আপনের জন্য খাঁড়ায়া আছি।”

তেরাব আলী বললেন, “একটা কথা বলি। আমারে বস বলবেন না। কবি বলবেন। আমি একজন কবি। বুকোস্কির মত বড় কবি।”

“বুকোস্কি কে? আচ্ছা যাক কবি ভাই, এসব জ্ঞানের কথা বাদ। আমি মূর্খ লোক। কাজের কথায় আসি।”

“হ্যাঁ আসো। কোথায়?”

“মহল্লাতেই। বাজারে।”

“মহল্লাতে কীভাবে? এখানে আমি ছয়মাস ধইরা আছি। জায়গাটা ভালো লাগছে।”

“কবি ভাই, আরও ভালো জায়গা দুনিয়াতে আছে। আর সেসব দায়িত্ব তো আমাদের ভাই। আপনের কাজ আপনে করবেন। আমাদেরটা আমরা।”

“ঠিক আছে। নাম কী?”

“সোহরাব। এইবার ইলেকশনে। কমিশনারিতে। চিনেন তো?”

“হ চিনি। পোস্টারে দেখছি। মোচওয়ালা না?”

“হ্যাঁ। চিনতে পারছেন। মোচওয়ালা। কালা। চেক শার্ট পইড়া ঘুরে। হালায় বউত হারামী। রেপ করছে কয়টা।”

“হুম। এরে দেখতে কাঠবিড়ালিদের মতো লাগে। কিছু কাঠবিড়ালিরে দেখলে মনে হইব ডোরাকাটা। যেন রয়েল বেঙ্গল টাইগার।”

“ভাই কী কন এইসব? বুঝি না।”

“তোমার বুঝার দরকার নাই। এখন বাকি কথা বলো।”

“বাকি কথা হইল কাজ শেষে এইখানে চইলা আসবেন। বাকিটা আমরা দেখব। আর কিছু নিয়া তো কথা কইতে হইব না। আমরা হইলাম গিয়া পুরানো মানুষ। হে হে হে...”

তেরাব আলী এই লোকের কালো কালো দাঁতের হাসি দেখতে অপছন্দ করেন। তিনি মাথা ঘুরিয়ে চলা শুরু করলেন। তাঁর গন্তব্য এখন বাজার। বৃষ্টি পড়া শুরু হয়েছে। অন্ধকার নেমে এসেছে। তেরাব আলী হাঁটছেন। তাঁর মনে হাঁটছে কয়েকশ কাঠবিড়ালি। তারা সবাই কবি। কবিদের মতো উজ্জ্বল চোখ নিয়ে তারা মার্চ করছে। তেরাব আলী এদের অনুভব করতে করতে চলেছেন। যেন তিনি নিজেই আপাদমস্তক কবিতা। মাত্রাবৃত্ত, অক্ষরবৃত্ত না অমিত্রাক্ষর? বিভিন্ন ছন্দের নাম শুনেছেন। তিনি আসলে কোন ধরনের কবিতা? কাঠবিড়ালিরা কোন ধরনের কবিতা লেখে? তাদের কি কোন পেত্রাক বা মধুসূদন ছিল? পেত্রাক না থাকলে তো সনেট হবে না। তেরাব আলী জানেন ইটালিয় কবি পেত্রাক সনেটের জনক। জনক না থাকলে সন্তান থাকবে না। যেমন তার বাপ তৈয়বুর রহমান না থাকলে তিনি হতেন না। তৈয়বুর রহমানকে তাঁর মনে পড়ে। হালকা লম্বা ধরনের লোক। শেষ বয়সে কুঁজো হয়ে গিয়েছিলেন কিছুটা। তাঁর নাম রেখেছিলেন শহিদুর রহমান। তেরাব আলীর সেই নাম হারিয়ে গেছে। তেরাব আলীর অনেক কিছুই হারিয়ে গেছে। তিনি হারানো জিনিস খোঁজেনও না। যে জিনিস নিজ থেকে হারিয়ে যায় তা খুঁজতে নেই।

সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে তেরাব আলী তাঁর কাজ সম্পন্ন করলেন। এরপর বাজারে কমলা মিষ্টান্ন ভান্ডারের পাশের খুপরি চায়ের দোকানে গেলেন। সন্ধ্যায় এক কাপ চা খাওয়া দরকার। তা না হলে গা ম্যাজম্যাজ করে।

চায়ের কাপ দিয়ে গেল ছোট এক ছেলে। খুপরি দোকানটাতে তিনটে বেঞ্চি। মাত্র তিন চারজন লোক বসে আছে। একজন বসেছে তাঁর সামনে। সেও চা সামনে নিয়ে। তেরাব আলী লোকটার চোখের দিকে তাকিয়ে আঁতকে উঠলেন। লোকটিও একই রকম তাঁর চোখের দিকে তাকিয়ে আছে। তাঁর চোখের শক্তি এবং স্পর্ধা দেখে অবাক হলেন তেরাব আলী। এই প্রথম কেউ তাঁকে চোখ দেখে বুঝে নিলো। তিনিও অবশ্য বুঝেছেন। আগে জানলে একটু সাবধান হওয়া যেত।

হয়েই যখন গেছে, তখন আর ভণিতা করলেন না তেরাব আলী। মুচকি হেসে বললেন, “আইজ কবিতা লেখার দিন, ঠিক না ভাই?”

লোকটা চায়ের কাপ নামিয়ে বলল, “হ। লেখছেন?”

তেরাব আলী মাথা নেড়ে বললেন, “একটু আগে। আপনে?”

লোকটা বলল, “আমি গত কালকে। এলাকা ছাইড়া এই জায়গায় আইলাম। এলাকাটা কেমন?”

তেরাব আলী চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে বললেন, “ভালো। আমি মসজিদের পাশের রাস্তা দিয়া যে গলি তার ডান দিকে থাকতাম। বাসার পাশে গাছ আছে। গাছে কাঠবিড়ালি। ভাই কি কাঠবিড়ালি পছন্দ করেন? আপনি আমার ঘরে উঠতে পারবেন। এক বছরের ভাড়া দেওয়া।”

লোকটা বলল, “দেখি।”

তেরাব আলী উঠে পড়লেন। বললেন, “যাই ভাই। সবাই বসে আছে।”

তিনি হাঁটা শুরু করলেন। রাস্তায় বৃষ্টির পানি জমেছে। শুষ্ক মাটির কণা বৃষ্টির পানিতে মিশে ছোপ ছোপ কাদায় পরিণত। স্যান্ডেলের ছিটা পিছন দিকটায় এসে লাগছে তেরাব আলীর। প্রতি পদক্ষেপে স্যান্ডেলের সাথে ভেজা মাটি ও পানির ঘর্ষণে শব্দও হচ্ছে। সেই শব্দকে মধুর মনে হচ্ছে তাঁর। এবার ভিতরের কবি কাঠবিড়ালিদের মার্চের সাথে শব্দও যোগ হলো। তেরাব আলী প্রকৃতির সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে গেলেন। এই বুঝি যাদু বাস্তবতা!

ইতিমধ্যে বাজারে হইচই পড়ে গেছে। কমিশনার পদে দাঁড়ানো সোহরাব হুসেনের লাশ পড়ে আছে বাজারের দক্ষিণ দিকে নিউ হেয়ার কাটিং সেলুনের সামনে। কে বা কারা এই কাজ করে গেল এই নিয়ে বাজার পুরো গরম। আধ ঘণ্টা পর পুলিশ এলো গাড়িতে করে।

আর ওদিকে গাড়িতে করে চলে যাচ্ছেন তেরাব আলী। অন্য কোথাও। গাড়িতে উঠে কিছুক্ষণ যাওয়ার পর তিনি বললেন, “ড্রাইভার গাড়ি থামাও। আমার জন্য পাশের দোকান থেকে কাগজ কলম নিয়ে আসো। আমি কবিতা লিখব।”

কথামত কাগজ কলম নিয়ে এসেছিল ড্রাইভার। তেরাব আলী কাগজ কলম নিয়ে গাড়িতে বসে আছেন। তাঁর মাথার ভেতরে এখন কাঠবিড়ালিরা আর অপ্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মার্চ করে যাচ্ছে না। এখন তারা ট্যাংকে করে যাচ্ছে। যুদ্ধ যুদ্ধ সাজে সাজানো ট্যাংক। ট্যাংক চলার সাথে সাথে খসখস আওয়াজ হচ্ছে। তেরাব আলী হাতে কাগজ কলম নিয়ে বসেই আছেন।

গাড়ির হেডলাইটে পড়ছে বৃষ্টির ফোঁটা। হেডলাইটের ভাঙা এক কোণ দিয়ে ভিতরে ঢুকে পড়েছিল এক খয়েরি রঙের ছোট ঘাসফড়িং। লাইটের কাচে পানির ফোঁটা জমায় ভিতর থেকে বাইরেটা ঝাপসা দেখছে খয়েরি ঘাসফড়িং। লাইটের উত্তাপে তার শরীর জ্বালাপোড়া করছে। কিন্তু সে নির্বিকার।

সে খবর জানেন না তেরাব আলী, পুলিশ, ড্রাইভার বা অন্য কেউ।

---- - সৃষ্টিসুখ থেকে প্রকাশিত 'মার্চ করে চলে যাওয়া একদল কাঠবিড়ালী' গল্পের বইয়ের দ্বিতীয় গল্প এটি। -

সমাপ্ত