১৬ জুলাই, ২০২৬
নগরকাকের গল্প
১ শামসোজ্জোহা বাসায় এসেই খবর পেয়েছে তার স্ত্রী ও কন্যা একসাথে কাক হয়ে উড়ে গেছে। এটি কোনো ভালো খবর না। খারাপ খবর। খারাপ খবরে শামসোজ্জোহার মন খারাপ হল। সে একহাতে জ্বলন্ত সিগারেট রেখে আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগল কী করা যায়।
দূরে শাহজালাল(র) এর দরগার মসজিদের উঁচু মিনারে নিচের রাস্তার দিকে তাকিয়ে বসেছিল এক নগরকাক। তারও মন খারাপ। তার মন খারাপের কারণ জানতে যেতে হবে একটু দূর...কিছু আগের ঘটনায়......
শহরের কাকদের তখন জমজমাট অবস্থা। এখানে সেখানে সবখানে প্রচুর কাক। কাকদের সম্মিলিত উড্ডয়নে মাঝে মাঝে সন্ধ্যায় আকাশ কালো হয়ে যেত। একেবারে কুচকুচে কালো। সূর্যের আলো আসার বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই।
তখন নগরবাসীরা নিজ নিজ ঘরে বৈদ্যুতিক বাতি জ্বালাত। জিন্দাবাজার পয়েন্টস্থ দোকানপাটগুলো রাত্রিকালীন যেসব বাতির আলোতে আলোকোজ্জ্বল হয়ে উঠে সেসব বাতিতে আলোকিত হয়ে উঠত। লোকেরা বলত, আইজ তাড়াতাড়ি রাইত অই গেল।
কেউ কেউ বলত, গ্লোবাল ওয়ার্মিং।
তখনকার কথা। সেই সময়ে আব্দুল মজিদের বাড়ির পাশের ডোবার লাগোয়া ছোট তালগাছের গর্তে কয়েকটি মাছরাঙা বাসা বেঁধেছিল। আব্দুল মজিদ যেতে আসতে মাছরাঙাদের দেখত এবং ভাবত এরা এখানে কী করে।
একদিন আব্দুল মজিদ ভোরবেলা উঠে ডোবার ধারে গিয়েছিল কোনো একটা কাজে। তখন তার চোখে পড়ে মাছরাঙাদের বাসা। সে বাসাটি ভেঙে ফেলে এবং তিনটি মাছরাঙা ধরে এনে তার বউকে বলে, তেল দিয়া ভাইজা ফেলো।
আব্দুল মজিদের বউ বলে, পাখি ভাজা গুনার কাজ।
আব্দুল মজিদ বলে, এরা বদ পাখি। বদ পাখি মানুষ খাবে না তো কী করবে।
আব্দুল মজিদের বউ এবং আব্দুল মজিদের কথা কাটাকাটি হয় পনেরো মিনিট। তারপর কোনো একটা কারণে আব্দুল মজিদের বউ পাখিগুলো ভাজতে রাজি হয়। কারণটা এখানে অপ্রাসঙ্গিক এবং এতে পাঠকের মনে হতে পারে আব্দুল মজিদ একজন নারী নির্যাতক, সেই কারণে কারণটি উহ্য থাকল।
পাখি ভাজার পর আব্দুল মজিদের সামনে যখন আনা হল তখন দেখা গেল কুচকুচে কালো তিনটি বস্তু পড়ে আছে।
দেখতেই ঘেন্না লাগে এমন। কিন্তু যেহেতু এটি পাখির মাংস এবং যেহেতু বউয়ের সাথে এর জন্য কথা কাটাকাটি করতে হয়েছে তাই এর একটু অংশ ভেঙে মুখে দিল আব্দুল মজিদ। তারপর থেকে আব্দুল মজিদ একটি কালো কুচকুচে নগরকাকে পরিণত হয় এবং শহরের যাবতীয় কাকেরা দ্রুত অদৃশ্য হয়ে যায়। তখন শহরে মাত্র কাক ছিল একটাই। এবং সে আব্দুল মজিদ।
আব্দুল মজিদ উঁচু উঁচু বিল্ডিংয়ের ছাদে, মসজিদের মিনারে বসে থাকত রাস্তার দিকে তাকিয়ে। সারাদিন সারারাত সঙ্গীহীন কাটিয়ে সে করুণ সুরে ডাকত। তার ডাক নগরের দেয়ালে দেয়ালে প্রতিহত হয়ে, অজস্র কর্ণকুহর পরিভ্রমণ করে হারিয়ে যেত বেশিরভাগ সময়। খুব কম সময় কেউ একজন তার ডাক লক্ষ্য করে উপরে তাকাত, সামান্য চোখের সাহায্যে খোঁজাখুঁজি করে আবিষ্কার করত উঁচুতে, খুব উঁচুতে মায়াবী চোখ নিয়ে বসে আছে এক নগরকাক।
এই গেল আব্দুল মজিদ তথা মাজারের মসজিদের মিনারে নিশ্চুপ হয়ে বসে থাকা নগরকাকের কথা।
বাকি রইল শামসোজ্জোহার স্ত্রী ও কন্যার কাহিনী। সেই কাহিনীর সাথে নিশ্চয়ই আব্দুল মজিদের কোনো সংশ্রব আছে। কারণ গণিতের হিসাব মতে শহরে তখন কাকের সংখ্যা তিনঃ
আব্দুল মজিদ শামসোজ্জোহার স্ত্রী শামসোজ্জোহার কন্যা
এই তিন কাকের প্রধান কাক আব্দুল মজিদ। অতএব, বাকি দুই কাকের সাথে তার সংশ্লিষ্টতা একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না। এবং যেহেতু আর কোনো সূত্রে শামসোজ্জোহার স্ত্রী কন্যার কাক হওয়ার কাহিনী জানা যাওয়ার সম্ভাবনা নেই, যেহেতু শামসোজ্জোহা সিগারেট হাতে নিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে মন খারাপ নিয়ে অতএব, গল্পের মূল কাহিনী জানতে অবশ্যই নগরের প্রধান কাক আব্দুল মজিদের উপর নির্ভর করা ছাড়া আর কিছু করার নেই।।
আব্দুল মজিদের দিকে লক্ষ্য রাখতে গিয়েই প্রথম আবিষ্কৃত হয় আব্দুল মজিদ দিনের সবসময় উঁচু উঁচু বিল্ডিংয়ের ছাদে বা মসজিদের মিনারে বসে থাকে না। সে দুপুরবেলা, যখন আকাশে সূর্য প্রবল উত্তাপে আসীন, তখন আব্দুল মজিদকে কোনো উঁচু বিল্ডিং বা মিনারে বসে থাকতে দেখা যায় না। তখন সে একা একা ডানা ঝাপটে উড়ে বেড়ায়। মানুষের ঘরবাড়ির আশেপাশে। মানুষের কাছাকাছি।
মানুষেরা কাক দেখে কিছু মনে করে না। তারা বুঝতে পারে না শহরে তখন মাত্র একটাই কাক। তারা মনে করে কাকের সংখ্যা অনেক কমেছে তবে কমলেও মোটামুটি সংখ্যায় তারা আছে। এছাড়া মানুষের এত সময় কোথায় কাকশুমারি করার।
অতএব, আব্দুল মজিদ তাদের কাছে গেলেও কেউ আগ্রহ নিয়ে তাকাত না। বিকেলে আবার যখন রোদ পড়ে যেত তখন আব্দুল মজিদ উঁচু বিল্ডিং বা মিনারের ছাদে বসে থাকত।
২ স্ত্রী ও কন্যা হারিয়ে শামসোজ্জোহা হাতে জ্বলন্ত সিগারেট নিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল। এই তাকানোই হয়তো তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল। অথবা হতে পারে তা ছিল তার জীবনের সবচেয়ে সঠিক কাজ, কেননা ভুল এবং সঠিকতা একটা আপেক্ষিক ব্যাপার।
শামসোজ্জোহা আকাশের দিকে তাকিয়ে প্রথম লক্ষ্য করে আকাশ আসলে সুন্দর। একটু পর পর পরিবর্তন হয়। আকাশের সৌন্দর্য পুরনো হয় না। সে তখন একদৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। সে এমন মুগ্ধ হয়ে আকাশ দেখছিল যে সে তার চোখের পাতাও ফেলছিল না। তার কালো চোখের মণিতে প্রতিবিম্বিত হচ্ছিল এক গুচ্ছ নীল আকাশ।
সে চোখের মণির প্রতিবিম্বিত অংশেই প্রথম দেখা যায় দুটি কালো কাক উড়ে যাচ্ছে। কিন্তু সত্যিকার আকাশে তাকিয়ে দেখা গেল কোনো কাক নেই। শামসোজ্জোহার চোখের মণিতে কাক কীভাবে এল তা গল্পের মূল চিন্তার বিষয়ে পরিণত হওয়ার পর এক অযৌক্তিক ব্যাখ্যা দাঁড় করানো হয়, হয়তো শামসোজ্জোহা তার স্ত্রী এবং কন্যাকে অত্যধিক ভালোবাসত, তাদের কাক হয়ে যাওয়ায় সে মনে অনেক দুঃখ পেয়েছে, তার মনের ভিতরের আকাশে তাই ঘোরপাক খাচ্ছে তার স্ত্রী ও কন্যা, কিন্তু যেহেতু তারা এখন কাক হয়ে গেছে তাই তাদের মানুষ ছবির পরিবর্তে কাক ছবিই ভেসে উঠছে।
এই ব্যাখ্যা অবৈজ্ঞানিক এবং অযৌক্তিক হলেও এর চেয়ে উৎকৃষ্ট কিছু পাওয়া না যাওয়ার বদৌলতে এটিই স্থির থাকল।
এই যখন অবস্থা ছিল তখন শহরের প্রধান কাক আব্দুল মজিদকে ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে উড়ে আসতে দেখা গেল। সে শামসোজ্জোহার মাথার চারপাশে চক্রাকারে ঘুরতে লাগল এবং তারস্বরে কা কা বলে চেঁচাতে লাগল।
তবুও শামসোজ্জোহার মোহ ভাঙল না। সে মন্ত্রমুগ্ধের মতো আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। তখন নগরের প্রধান কাক আব্দুল মজিদ শামসোজ্জোহার নাকের উপর বসল। নাকের উপর, ধারালো নখের উপর ভর করে বসে সে শামসোজ্জোহার কালো চোখের দিকে ঘাড় কাত করে তাকিয়ে দেখল ওখানে নীল আকাশ দেখা যায়।
প্রধান নগরকাক আব্দুল মজিদ মনোযোগ দিয়ে তাকাতেই দেখতে পেল শামসোজ্জোহার চোখের আকাশে কাক উড়ছে। সঙ্গীবিহীন কাক আব্দুল মজিদের কালো চোখ আনন্দে চকচক করে উঠল। সে কোনো কিছু না ভেবে শামসোজ্জোহার চোখে ঠোকর দিয়ে কাকগুলোকে মুক্ত করে দিতে চাইল।
শামসোজ্জোহার চোখ মুহূর্তেই রক্তাক্ত হয়ে উঠল, রক্তাক্ত হয়ে উঠল প্রধান নগরকাক আব্দুল মজিদের কালো ঠোঁট।
রক্তের লাল রঙে বিচলিত আব্দুল মজিদ লাফ দিয়ে সরে গেল। শূন্যে ভাসতে ভাসতে শামসোজ্জোহার চক্ষুহীন কোটরে কয়েকবার দৃষ্টি নিক্ষেপ করে সে উড়াল দিল আকাশে।
চোখহীন শামসোজ্জোহা ঠিক আগের মতোই আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। বোঝা গেল, চোখ থাকা না থাকায় তার কোনো সমস্যা হচ্ছে না।
এরপর থেকে নগরে দেখা যেত তিনটি কাক একসাথে ঘুরছে।
সমাপ্ত