১৭ জুলাই, ২০২৬
ডানাযুক্ত গল্প
তখন ঘুমের সময়। রাত দুটা। কিন্তু আমি জেগে ছিলাম। জেগে ভাবছিলাম আমার কেন ডানা নাই। যেন ডানা না থাকাটা এক বিরাট অসম্ভব এক ব্যাপার – এইরকমই আমার মনে হচ্ছিল তখন। দুঃখ হচ্ছিল কিছুটা। সেই সময়ে ঠিকঠিকিও ডেকে উঠল। সত্য কথা কেউ বললে বা কারো মনে হলে ঠিকঠিকি ডাক দেয় ঠিক ঠিক করে। সত্যমিথ্যা জানি না, ঠিকঠিকির এই ব্যাপারটা শুনে আসছি। সেই ছোটকাল থেকে। তাই আমার মনে হলো আমি যেন ঠিক একটা ব্যাপার ভাবছি। অত্যন্ত ন্যায্য একটা ব্যাপার ভাবছি যে আমার কেন ডানা নাই।
সেই সময় আবার মনে হলো ঠিকঠিকিরও তো ডানা নাই। তারও কি আমার মতো রাইত দুইটার সময় এইরকম চিন্তা মাথায় আসে? হয়তো আসে। নাহলে এই রাতে সে ঘুমায় নাই কেন? আমার কথার লগে ঠিক ঠিক করতেছেই বা কেন?
আমার জীবনে দুইখান ডানা থাকলে কি হইত আমি ভাবি। আসমানে কি চইলা যাইতে পারতাম। অথবা এইখানে সেইখানে। অথবা যেইখানে শময়িতাদের বাড়ি। শময়িতা মাইয়াটা কে আমি জানি না। তার প্রতি আমার কোনো ইন্টারেস্ট নাই। তবে তাগো বাড়ির প্রতি আছে। আমি এক কবিতার বইয়ে পড়ছি। তবে কবিতার বইয়ে বাড়ি থাকে না। এইখানে ইটকাঠসিমেন্ট রাখার জায়গা নাই। ডিজাইন-ডুজাইন করারও কিছু নাই। সেপ, অটোক্যাড ইত্যাদি দিয়া আঁকিবুকিরও কিছু নাই। কিছুই নাই, বাড়ি বানানোর জায়গাই নাই। অথবা হয়তো আছে। আছে সবকিছু—পাহাড়, নদী, গাছ, ফড়িং। ঝুলন্ত পাহাড় আর সেই পাহাড়ে উইঠা যাওয়া একটা মেয়ে যে জীবনে প্রথমবার একটা পাহাড়ে উইঠা দেখে পাহাড় থেইকা নামার কোনো উপায় নাই। কারণ পাহাড়টাই ঝুলন্ত পাহাড়।
এইসব থাকতেও পারে। আমি হয়তো দেখতে পাই না। আমি অনেক কিছুই দেখতে পাই না, বুঝতে পাই না। এইটা শুধু আমার ক্ষেত্রে না। সব মানুষের ক্ষেত্রেই। সব মানুষই অনেক কিছু পারে না। অনেক কিছু পায় না। যেমন আমি ডানা পাই নাই। এইটার কি ব্যাখ্যা হইতে পারে? বিবর্তনবাদী ব্যাখ্যায় যেইসব প্রজাপতি বের হইয়া আসে তারা আমার মগজে ঢুইকা থাকে। আমারে মন্ত্রণা দেয়। কিন্তু তাগো মতো ভাবলে আমার হয় না। কিছু না, এই ভালো লাগে না আর কি। আমি ভাবি হয়তো অন্য কিছু আছে। অন্য কিছু যার কারণে কিছু লোক কবিতার বইয়ে ঘাসফুল লতাপাতা নীল জেব্রা এবং তুমুল গন্ধময় ফুলের পাপড়ির ভেতরে বইসা থাকা রাজহংসীর দল দেখতে পায়। অথবা তারা গন্ধ শুঁকে একেকটা কবিতার বইয়ে মাতাল হইয়া পইড়া থাকে। এরা কম থাকে। সংখ্যায় কম থাকে। কিন্তু এরা থাকে। বাঁইচা থাকে। এদের এই যে ক্ষমতা, এইগুলা তারা যেইখান থেইকা পায় আমার ধারণা হয় সেইখান থেইকা আমারে এইসব কিছু দেয়া হয় নাই। আমারে ধরা হইছে অন্য কিছু হিসাবে। কোনো একজন লোক যে রাত দুইটায় ঘুমাবে না। না ঘুমাইয়া ডানা লাগাইয়া ঘুরার চিন্তা করবে। তার লগে থাকবে একটা ঠিকঠিকি। সেই ঠিকঠিকিও নিশ্চয়ই আমারই মতো। ঐসব ক্ষমতা থেইকা বঞ্চিত। ঠিকঠিকিদের সমাজেও এইরূপ কিছু থাকার সম্ভাবনা আছে। অন্তত আমার এইটাই ভাবতে হইবে কারণ আমি তো জানি না তাগো সমাজ কীরকম চলে। আমি ঘুমাইলাম আরো পরে। মনে হয় তখন বাজে চাইরটা। ঘুম থেইকা উঠলাম বারোটায়। উইঠা বাথরুমে গেলাম। মুখটুক ধুইয়া ব্রাশ-ট্রাশ কইরা বের হইয়া প্যান্ট-শার্ট পইড়া বাইর হইলাম। আইজ দেরি হইয়া গেছে। রাস্তার মোড়ে চায়ের দোকানে গিয়া বইতেই হাফিজুদ্দি কইল, ইশ! স্যার দেরি কইরা ফালাইছেন।
আমি কইলাম, হ। যেইভাবে দেরি করতাছি কোনোদিন দেখবা চাকরি নাই।
হাফিজুদ্দি চায়ের কাপের চা চামচ দিয়া নাড়তে নাড়তে কইল, আরে না। অফিসের কথা না। একটু আগে যদি আইতেন দেখতে পাইতেন। বিরাট মিস করছেন।
সে আমারে চায়ের কাপ আগায়া দিল। আমি হাতে নিলাম।
তারে জিগাইলাম, কি বিষয়?
হাফিজুদ্দি কইল, স্যার, একটু আগে তিনটা পাখি একজনরে কিইনা দিলাম। বেঁচতে লইয়া আইছে এক লোক। একশো টাকায় দিয়া দিল।
তুমি নিজে রাখলা না কেন?
আমার বউ পাখি খায় না। তাই নিজের জন্য নিতে পারি নাই। আপনি অফিসে যান নাই জানলে আপনার জন্য রাইখা দিতাম। জেতা পাখি।
জেতা পাখি? ক্যামনে ধরছে?
ধরছে ক্যামনে কইতে পারি না। তবে লোক পাখি শিকারি না। ওইগুলারে আমি চিনি। ওরা হইলে একটা তিনশ কইরা নিত। পাখিগুলার ডানা কাটা ছিল।
আমি হাফিজুদ্দির দোকানে চা খাইলাম। টাকা দিলাম। দিয়া একটা রিকশা নিলাম। রিকশা নিয়া অফিসে যাইতেছি। রইদ উঠছে। কঠিন রইদ। এমন রইদে কাকেরা কা কা ডাকে। আমি উঁচা উঁচা বিল্ডিংগুলায় তাকায়া দেখলাম কোনো কাক দেখা যায় কি না। চারদিক তাকাইয়াও কোনো কাক দেখা গেল না। কিন্তু নিচে তাকাইয়া ডাস্টবিনের ধারে কিছু কাক দেখলাম। এরা মাঝে মাঝে লাফ দিতাছে। এবং তারা খাওয়ায় ব্যস্ত।
এদের দেইখা কেন জানি হঠাৎ কইরা মনে হইল হাফিজুদ্দি বলছিল পাখিগুলার ডানা ভাঙা ছিল। পাখির ডানা ভাঙল কে? কেন ভাঙল? একজনের ডানা আরেকজন কেন ভাঙবে? পৃথিবীতে কত কি আছে যাগো ডানা নাই। ডানা কি সহজ জিনিস নাকি।
আমার মাথা গরম হইয়া উঠতেছিল। উপরে আবার সূর্য তার গরম ছাড়তেছে। ভালোভাবে বললে হয়, সূর্য তার প্রবল উত্তাপ বিকীর্ণ করছিল। আমার খারাপ লাগতেছিল। মনে হইতেছিল পাখিগুলার ডানা কেউ ভাঙে নাই। আমার ডানা ভাঙছে। কি করমু কিছু বুঝতে না পাইরা রিকশাওয়ালারে জিগাইলাম, রিকশাওয়ালা ভাই, কারো ডানা ভাঙা কি ঠিক?
রিকশাওয়ালা ঘাড় ঘুরাইয়া একবার আমার দিকে তাকাইল। তারপর আবার তার রিকশা চালাইতে মনোযোগ দিল।
আমার চোখ ঝাপসা হইয়া আসতেছিল। আমি রাস্তার দিকে তাকাইলাম। ঝাপসা দেখা যাইতেছে সবকিছু। অস্পষ্ট। আমি চোখ মুছলাম। চোখ মুইছা তাকাইয়াও দেখি ঝাপসা লাগে! তখন আমি ডানদিক বামদিক সবদিক তাকাইয়া দেখি আমি রাস্তা থেইকা অনেক উপরে উইঠা গেছি। আমার রিকশার দুই পাশে বড় দুইটা ধবধবে সাদা ডানা। রিকশা পাখা ঝাপটাইতে ঝাপটাইতে বিশাল এক পাখির মতো উইড়া যাইতেছে।
আর প্রচণ্ড বাতাসে উড়তেছে রিকশাওয়ালার লম্বা কোঁকড়া চুল।
সমাপ্ত