সব গল্প

১৬ জুলাই, ২০২৬

চিড়িয়াখানা

সাইফুর রহমানের স্ত্রী সুদীপ্তা বসু সকালে গিয়ে দেখল সেই বিশেষ ঘটনা এবং এসে সাইফুর রহমানকে ঘুম থেকে জাগিয়ে বলল, “যাও তোমার মাকে গিয়ে দেখে আসো।”

সাইফুর রহমান জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে?”

তার স্ত্রী বলল, “কী আর হবে। উনার স্বভাব চরিত্র ছিল তেলাপোকার মতো। এখন হয়েছেনও তাই।”

সাইফুর রহমান হাই তুলতে তুলতে বিছানা থেকে নেমে তার মায়ের রুমে গেল। গিয়ে দেখল তার মা বিছানায় পড়ে আছেন। তার শরীর তেলাপোকার শরীরে রূপান্তরিত হয়েছে। মানুষের এরকম পোকায় রূপান্তরিত হওয়া পৃথিবীর ইতিহাসে সম্ভবত একবারই হয়েছিল। কাফকার পৃথিবীতে গ্রেগর সামসা যেদিন ঘুম থেকে উঠে দেখেছিল সে বিরাট এক পোকায় পরিণত হয়েছে।

সাইফুর রহমান তার মায়ের অবস্থা দেখে অচেতনভাবে বলে উঠল, “ওয়াও।”

সাইফুর রহমানের মা গুলবাহার বানু ছেলের দিকে তাকালেন। তার চোখ ভাবলেশহীন। চোখের পাশে এখন দুটি এন্টেনা বের হয়েছে। তিনি এন্টেনাদুটি নাড়িয়ে ফ্যাসফ্যাসে গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “কী চাস তুই?”

সাইফুর রহমান বলল, “কিছু না।”

সে বাথরুমে চলে গেল। দাঁত ব্রাশ করতে করতে সে অন্যদিকে মনোযোগ দেয়ার চেষ্টা করছিল। ইদানীং অফিসে প্রচুর কাজের চাপ। বাথরুমের দরজা খোলা ছিল। দরজার সামনে তার স্ত্রী এসে জিজ্ঞেস করল, “এখন কী করবে?”

সাইফুর রহমান থুঃ করে টুথ পেস্টের ফেনাযুক্ত থুতু বেসিনে ফেলে জিজ্ঞেস করল, “কোন বিষয়ে?”

“তোমার মায়ের বিষয়ে। উনাকে এখন আর তো ঘরে রাখা যাবে না।”

“কেন? যাবে না কেন?”

“শুঁড় নাড়িয়ে নাড়িয়ে ফ্যাসফ্যাস শব্দ করে যাচ্ছেন। নাস্তা নিয়ে গিয়েছিলাম। বললেন, খাব না।”

“খাবেন না কেন?”

“কি জানি কেন। ম্যামালদের ফুড উনি এখন খাবেনই বা কেন? অর্থ্রোপোডা পর্বের ইনসেক্টা শ্রেণীর প্রাণীরা কী খায় আমি বলতে পারবো না।”

“আচ্ছা।”

“আচ্ছা কী?”

“আচ্ছা মানে ভাবছি ব্যাপারটা নিয়ে কী করা যায়।”

“কয়েকদিন আগে যে অল্ডহোমের কথা বলেছিলে, তার কী হল?”

“হ্যাঁ, ওটা নিয়েই ভাবছি। ওখানকার ব্যবস্থা ভালো শুনেছি। আজই গিয়ে একবার দেখা করে আসব।”

সাইফুর রহমান হাত মুখ ধুয়ে বাথরুম থেকে বের হল। প্রাতঃরাশ সেরে অফিসে চলে গেল। অফিস শেষে বিকেলের দিকে শহর থেকে কিছুটা বাইরের দিকে সদ্য স্থাপিত হওয়া এক অল্ডহোমে গেল সে। এই অল্ডহোমের ব্যাপারে সে শুনেছে তার এক বন্ধুর কাছ থেকে। ঐ বন্ধুর কোনো এক আত্মীয়কে এখানে রাখা হয়েছে।

অল্ডহোমটির মালিক একজন ভদ্রমহিলা। বয়স পঁয়তাল্লিশের মতো কিন্তু দেখতে বেশ শক্তসমর্থ। তার মধ্যে পুরুষালি ভাব আছে। ভদ্রমহিলা আন্তরিকতার সাথে সাইফুর রহমানের সাথে কথা বললেন।

সাইফুর রহমান জিজ্ঞেস করল, “আপনাদের ব্যাপারে শুনেছি। আসলে আমার মাকে এখানে রাখতে চাই।”

ভদ্রমহিলা বললেন, “খুবই ভালো চিন্তা। আমাদের এখানে যেসব ফ্যাসিলিটি পাবেন অন্য কোথাও তা পাওয়া অসম্ভব।”

সাইফুর রহমান জিজ্ঞেস করল, “আমি শুনেছি আপনাদের সার্ভিস বেশ ভালো, কিন্তু আরেকটু জানতে চাই।”

“কী জানতে চান জিজ্ঞেস করুন।”

“কেন আপনাদের এখানে যে সার্ভিস দেন তা অন্য কোথাও পাওয়া সম্ভব না?”

“তার কারণ হচ্ছে অন্যেরা মূলত ব্যবসায়িক দিকটা দেখে। কিন্তু আমরা সামগ্রিক চিত্রটা বিবেচনায় এনে কাজ করি। আমাদের এই প্রতিষ্ঠানকে আপনি যদি কোনো ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান মনে করেন তাহলে ভুল করবেন। এটা কখনোই কোনো ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান নয়। এটি একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান।”

“কেমন টাকা দিতে হয় মানে আপনাদের চার্জটা?”

“ওসব নিয়ে একেবারেই ভাববেন না। ভর্তির সময় ওয়ানটাইম আমরা নামেমাত্র কিছু টাকা রেখে থাকি। এছাড়া আর কোনো টাকা দিতে হয় না আমাদের। আমি আগেই বলেছি আমাদের প্রতিষ্ঠান সেবামূলক। সেবাই আমাদের লক্ষ্য। অন্য প্রতিষ্ঠানেরা যেখানে লুক আফটারের জন্য কিংবা অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার জন্য চার্জ নেয় আমরা এক্ষেত্রে পুরোপুরি ব্যতিক্রম।”

“অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার জন্যও আপনারা টাকা নেন না?”

“অবশ্যই না। এখানে দিয়ে দেয়ার পর সব ঝামেলা আমাদের। ইভেন কেউ মারা গেলে যারা তাকে দিয়ে গেছে তাদের আমরা জানানোর প্রয়োজন মনে করি না।”

“কেন?”

“কারণ ঝামেলামুক্ত হবার জন্যই লোকে আমাদের বেছে নেয়। আমরা লোকদের ঝামেলা নিজের কাঁধে নিয়ে নেই। ঝামেলা কাঁধে নেয়ার পর ঝামেলাটা আমাদের হয়ে যায়। কেউ মারা গেলে সে খবর তার আত্মীয়দের জানালে ক্ষেত্রবিশেষে তারা বিরক্ত হতে পারে। তাদের নিত্যনৈমিত্তিক জীবনযাপনে কিছুটা বাধা তৈরি হতে পারে। অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় তাদের আসতে হতে পারে। তখন আমাদেরও কিছু সময়ক্ষেপণ হবে, উনাদের হবে সময়ক্ষেপণ ও ভোগান্তি। তাই আমাদের এই অবস্থা। আফটার অল, সময় খুব মূল্যবান।”

“তা ঠিক বলেছেন।”

“হ্যাঁ, আর ইদানীং যে হারে লোকদের বৃদ্ধ মা বাবা কিম্ভূতকিমাকার সব পোকায় পরিণত হচ্ছেন সে হিসেবে আমাদের পুরো কাজটাই হয়ে উঠেছে চ্যালেঞ্জিং। এখানে টাইম ম্যানেজমেন্টটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”

সাইফুর রহমান ভদ্রমহিলার সাথে আরো কিছুক্ষণ কথা বলল। ভদ্রমহিলা কথায় কথায় তার প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে অনেক কথাই বললেন। কীভাবে তিনি প্রথম শুরু করলেন, প্রথমে কী ধরনের সমস্যা হয়েছিল, কীভাবে তিনি তা কাটিয়ে উঠলেন ইত্যাদি অনেক কিছু। ভদ্রমহিলার সাথে কথা বলতে বলতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে এল। সাইফুর রহমান নির্দিষ্ট কিছু কাগজে সাইন করে কিছু টাকা জমা দিয়ে ভর্তির কাজগুলো সেরে নিল। ভদ্রমহিলা সাইফুর রহমানের সাথে হাত মেলাতে মেলাতে বললেন, “আগামীকাল সকালেই আমাদের লোক গিয়ে আপনার মাকে এখানে নিয়ে আসবে।”

সাইফুর রহমান ধন্যবাদ জানিয়ে অল্ডহোম থেকে বের হল। সে যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। যেন বড় একটি পাথর বসে ছিল তার ভেতরে।

সে যখন তার গাড়ির কাছে গেল তখন পুরনো খাকি শার্ট প্যান্ট পরা একটি লোক তার সামনে এসে দাঁড়াল। লোকটির কাঁধে ঝোলানো চটের ব্যাগ। মুখ ভাঙা, লম্বায় ৬ ফুট হবে।

লোকটি চিকন গলায় বলল, “স্যার, আপনার সাথে একটু কথা ছিল। আজকের সন্ধ্যাটা দারুণ।”

সাইফুর রহমান সন্দিগ্ধ চোখে তাকিয়ে বিরক্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, “কী কথা?”

লোকটি বলল, “স্যার, আপনাকে একটা কথা বলি। আমাদের সবারই বিনোদনের দরকার আছে।”

সাইফুর রহমান বিরক্ত হয়ে বলল, “আপনি আমার সামনে থেকে সরেন। আমি গাড়িতে ঢুকব।”

লোকটি বলল, “স্যার বিরক্ত হবেন না। আমি একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজে আপনার কাছে এসেছি।”

“কী কাজ?”

“স্যার, এখান থেকে এই মাত্র বিশ মিনিটের পথ গেলেই রয়েছে পৃথিবীর বিখ্যাত চিড়িয়াখানা ওয়ান্ডারল্যান্ড। দুনিয়ার সব আজব আজব পশুপাখির যেন এক খনি স্যার। কী নেই সেখানে! যত প্রাণী আপনি দেখেছেন, যত প্রাণীর কথা আপনি ভেবেছেন জীবনে, সব আছে এখানে।”

“কিন্তু চিড়িয়াখানার ব্যাপারে আমার বিন্দুমাত্র কোনো আগ্রহ নেই। আপনি দয়া করে যান। আমি নিজেই অনেক সমস্যায় আছি।”

“স্যার, আপনি যে সমস্যায় আছেন তা বুঝেই এসেছি। আপনার ভিতরে বড় এক পাথর বসে ছিল। মানুষ নিজেদের ভেতরের পাথর নামাতেই ওয়ান্ডারল্যান্ডে যায় স্যার। আমি তাই আপনার কাছে এসেছি। আমি চিড়িয়াখানার এজেন্ট।”

সাইফুর রহমান কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ভাবল। তারপর প্রায় ধাক্কা দিয়ে লোকটিকে সরিয়ে গাড়িতে উঠে স্টার্ট নিল। লোকটি তার কাঁধে ঝুলানো ব্যাগ ধরে চলে যাওয়া গাড়ির দিকে তাকিয়ে ছিল।

সে বাসায় গিয়ে শুনল তার মা সারাদিনে স্যুপ ছাড়া কিছু খাননি। সারাক্ষণ চাদর দিয়ে শরীর ঢেকে রেখেছেন। সাইফুর রহমান বাসায় প্রবেশ করতেই তিনি তার ফ্যাসফ্যাসে গলায় হাঁক ছাড়লেন, “সাইফুর, সাইফুর...”

সম্ভবত তিনি তার এন্টেনার মাধ্যমে তার উপস্থিতি টের পেয়েছিলেন।

সাইফুর রহমান দরজার পাশে গিয়ে বলল, “কী? ডাকছেন কেন?”

তিনি বললেন, “খাটে এসে বস।”

সাইফুর রহমান গিয়ে বসলেন। গুলবাহার বানু তার এন্টেনা নাড়াতে নাড়াতে বললেন, “তোর বউ আমারে মাইরা ফেলব।”

সাইফুর রহমান অবাক হয়ে বললেন, “কেন? কী হয়েছে?”

“তোর ছোট পোলায় আসছিল আমার কাছে। সে বলল তার মা তাকে বলেছে তেলাপোকার মাথা কাটলেও বেঁচে থাকে। তোর ছোট পোলায় আমারে বলে, “দাদী তোমার মাথা কাটলেও কি বেঁচে থাকবে?”

“সত্যিই তো তেলাপোকার মাথা কাটলে বেঁচে থাকে।”

“তাইলে তুই ও তর বউয়ের মতো কথা কস!”

সাইফুর রহমান দ্রুত খাট থেকে উঠে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। তার মা গুলবাহার বানু ইতিমধ্যে ফ্যাসফ্যাসে গলায় তর্জন গর্জন শুরু করেছেন। পাশের টেবিলে রাখা জিনিসপত্র শুঁড় দিয়ে মেঝেতে ফেলছেন। কিন্তু চাদরটা ফেলে উঠছেন না। কারণ তেলাপোকারা স্বভাবগতভাবে থিগমোট্রোপিক।

খাবার টেবিলে রাতের খাবার খেতে খেতে তার স্ত্রী জিজ্ঞেস করল, “কী ব্যবস্থা করলে? এখানে থাকা তো অসম্ভব হয়ে পড়েছে।”

সাইফুর রহমান বলল, “কাল সকালে নিতে লোক আসবে।”

তার স্ত্রী একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। মনে হল তার ভিতরেও একটা পাথর ছিল।

সেদিন রাতে বিছানায় ঘুমানোর আগে সাইফুর রহমান তার স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা, মানুষের ভেতরে কি পাথর থাকতে পারে?”

তার স্ত্রী প্রথমে বেশ অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল। তারপর হাসিমুখে বলল, “অবশ্যই থাকতে পারে। পারবে না কেন? পাথর, পাহাড়, বাড়ি, ঘর সব থাকে তোমার ভেতরে।”

সে রাতে তারা বেশ নির্ভার ছিল। দুজনের ভেতরের পাথরই নেমে গেছে। সুতরাং, তারা কিছুক্ষণের মধ্যে একে অপরকে শারীরিক এবং মানসিকভাবে অনুভব করা শুরু করল। অতঃপর ঘুমিয়ে গেল।

পরদিন সকালে অল্ডহোম থেকে তিনজন লোক এল একটা বড় ভ্যানগাড়ি নিয়ে। তারা তিনজন মিলে সাইফুর রহমানের মাকে টেনে ভ্যানগাড়িতে নিয়ে তুলল। তিনি প্রথমে যেতে চাননি। ফ্যাসফ্যাসে গলায় চিৎকার জুড়ে দিয়েছিলেন। অল্ডহোমের অভিজ্ঞ লোকরা পরিস্থিতি বুঝতে পেরে ইনজেকশন দিয়ে তাকে অজ্ঞান করে ভ্যানে নিয়ে তুলল এবং চলে গেল।

সকালে নাস্তার টেবিলে বসে সাইফুর রহমানের স্ত্রী জিজ্ঞেস করল, “আজ তোমার অফিস আছে?”

সাইফুর রহমান বলল, “হ্যাঁ আছে। তবে ভাবছি যাবো না।”

“কেন? শরীর খারাপ?”

“না, ভাবছি চিড়িয়াখানায় যাবো।”

“চিড়িয়াখানা?”

“হ্যাঁ, চিড়িয়াখানা। ওয়ান্ডারল্যান্ড, শহরের কিছুটা বাইরের দিকে অল্ডহোম থেকে বিশ মিনিটের পথ। তুমিও তৈরি হয়ে নাও। একসাথে যাবো। সেখানে অনেক পশুপাখি আছে।”

সমাপ্ত