সব গল্প

১৯ জুলাই, ২০২৬

গাধা

আমার প্রতিবেশী ছিল বুড়া ক্রিস্টোফার। ধবধবে সাদা দাঁড়ি তার।

একবার দেখলাম সে একটি কালো গাধা নিয়ে এসেছে। সেটাকে ঘাস খাওয়ায়, বিকেলে সেটাকে নিয়ে ঘুরতে বের হয়।

একদিন বাসার সামনেই, পথে আমার সাথে তার দেখা হলো। আমি তার গাধার দিকে লক্ষ্য করে সামান্য হেসে, ভদ্রতাবশত বললাম, এটা কি গাধা?

ক্রিস্টোফার অমায়িক হাসি হাসলো। জিজ্ঞেস করলো, মিস্টার হামিদ, তুমি তো মুসলিম?

আমি বললাম, তা বলতে পারো। কেন?

ক্রিস্টোফার বলল, এই আমার গাধাটি আমি এনেছি মিশর থেকে। এমন কালো গাধা আর দেখেছো কখনো?

আমি বললাম, না, দেখিনি এমন।

ক্রিস্টোফার বলল, তোমাদের প্রফেটের এমন একটি গাধা ছিল। যে গাধার পূর্বপুরুষেরা একসময় যিশুকে বহন করেছিল। তারপর তাদেরই উত্তর পুরুষ হিসেবে ঐ গাধা তোমাদের প্রফেটকে বহন করে।

আমি বললাম, তাই নাকী! আমি কখনো এটা শুনি নাই।

ক্রিস্টোফার বলল, ঐ গাধা কথা বলতে পারতো। প্রফেট জিজ্ঞেস করলেন তোমার নাম কী। গাধা বলল, ইয়াজিদ বিন শিহাব। কিন্তু প্রফেট ঐ নামে তাকে ডাকতে চাইলেন না। নাম দিলেন ইয়াফুর। এটা কেন করেছিলেন, কোন ধারণা করতে পারো?

আমি বললাম, না।

ক্রিস্টোফার তার গাধার পিঠ হাতাতে হাতাতে বলল, বুক অব জেনেসিসে ঈশ্বর আদমের সামনে দিয়ে সব প্রাণীকে হাঁটিয়ে নিয়ে গেলেন। আদমের যেটার নাম যা মনে আসলো তাই বললেন। এর মাধ্যমে তিনি নাম দিলেন। নামকরণ হলো নিয়ন্ত্রণ। আমার মনে হয়, এইজন্যই তিনি গাধাটিকে নতুন নাম দিয়েছিলেন।

আমি বললাম, তা তোমার গাধার নাম কী?

ক্রিস্টোফার হেসে বলল, আমি উদার, নিয়ন্ত্রণে অনাগ্রহ। কোন নাম দেই নি।

আমি বললাম, তাহলে ডাকো কীভাবে?

ক্রিস্টোফার বলল, আপাতত ইশারা ও শিস দিয়ে কাজ চালাচ্ছি। আচ্ছা, আমি একে ইয়াফুর নাম দিলে কি তোমার ধর্মানুভূতিতে আঘাত লাগবে?

আমি বললাম, অবশ্যই না। তোমার গাধা, তুমি যা ইচ্ছা নাম দাও।

ক্রিস্টোফার হাসি হাসি মুখে, কিছুটা ঝুঁকে এসে বলল, মিস্টার হামিদ, তোমার কি কৌতূহল কম?

আমি বললাম, না, তা কেন হবে!

ক্রিস্টোফার বলল, তাহলে তুমি যে জিজ্ঞেস করলে না, আমার গাধাটির বিশেষত্ব কী? সে কথা বলতে পারে কি না? বা আমি কেন তাকে সুদূর মিশর থেকে নিয়ে আসলাম?

আমি বললাম, কেন, তোমার গাধাও কী কথা বলতে পারে নাকী?

ক্রিস্টোফার বলল, বিশ্বাস হচ্ছে না?

আমি বললাম, দেখাও তো কথা বলিয়ে।

ক্রিস্টোফার তার গাধাটির সামনে গিয়ে ইশারা করলো। কয়েকবার শিস দিল। কিন্তু মনে হলো না গাধাটির এতে কোন আগ্রহ আছে। সে গম্ভীর মুখে ঘাস চাবাতে থাকলো।

ক্রিস্টোফার কিছুক্ষণ চেষ্টা করে বলল, এখন কথা বলবে না। হয়ত তার মুড নেই কথা বলার।

ঠিক এই সময়ে গাধাটি আপন স্বরে ডেকে উঠল। এয়্যাক…আ…হেয়্যাকে।

আমি ক্রিস্টোফারের মুখের দিকে তাকালাম। তার ভাব ভঙ্গির তেমন কোন পরিবর্তন হয়েছে বলে মনে হলো না। সামান্য ভ্রু কুঁচকে গেছে।

আমি কিছু বলার আগেই সে বলল, গাধা সকল সময় কথা বলে না। কথা বলে তাদের মর্জিমাফিক। তবে আমার কথার উপর তুমি বিশ্বাস রাখতে পারো। এই গাধাটি আমি মিশর থেকে নিয়ে এসেছি কারণ মিশরের সম্রাটই তোমাদের প্রফেটকে ঐ গাধা দিয়েছিলেন।

আমি বললাম, তার মানে তুমি বলতে চাচ্ছো এটা ওই গাধার বংশধর যা আমাদের নবী ও নবী যিশুকে বহন করেছিল? ক্রিস্টোফার বলল, শতভাগ নিশ্চিত হয়ে কিছু বলছি না এখন। কারণ তোমাদের প্রফেটের গাধাটি তার মৃত্যুর পর সুইসাইড করে।

আমি বললাম, গাধা সুইসাইড করে?

ক্রিস্টোফার বলল, হ্যাঁ, একটা কুয়াতে ঝাঁপিয়ে মরে সে আত্মাহুতি দেয়। ফলে, আমার এই গাধাটি তার বংশগতির কেউ কি না এখনো নিশ্চিত না। আমি খোঁজ লাগিয়েই কিনেছি, এবং এখনো আরো খোঁজ চলছে। ১৫% নিশ্চিত, ৮৫% নিশ্চয়তা বাকী রয়েছে। অনেক প্রাচীন প্রমাণাদি দরকার। বুঝোই তো, অনেককাল আগের মামলা।

ক্রিস্টোফারের কথা আমি ঐদিন বিশ্বাস করলাম না আবার অবিশ্বাসও করলাম না। মানে মাথায় নেই নি এমন অবস্থা। কারণ বুড়া লোকেরা মাঝে মাঝে নানা কথা বলে, বাচ্চাদের সব কথা যেমন ধরতে হয় না, এদের সব কথাও ধরতে নেই, এমন আমার মনে হয়েছিল।

আমি প্রতিদিন আমার বাসা থেকে দেখতাম বুড়া ক্রিস্টোফার তার গাধাটিকে খাওয়াচ্ছে, বাইরে নিয়ে যাচ্ছে, মাঝে মাঝে এও দেখতাম সে গাধাটির সাথে কথা বলে যাচ্ছে। গাধা মাথা নাড়ছে। উত্তর দিচ্ছে কি না দূর থেকে শুনতে পেতাম না। আগ্রহও হয় নি।

মাস খানেক পরে একদিন সকালে আমার ঘরের দরজায় ডাকাডাকি শুরু হলো। দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এসে দেখি ক্রিস্টোফার তার কালো গাধা নিয়ে দাঁড়িয়ে। আর তিনজন পুলিশ। ক্রিস্টোফারের হাতে হাতকড়া।

ক্রিস্টোফার পুলিশের অনুমতি নিয়ে আমাকে টেনে একপাশে সরে গেল। তারপর বলল, একটা ঝামেলা হয়েছে মিস্টার হামিদ। এরা আমাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। একটা ভুল বোঝাবুঝি। আমি বেরিয়ে আসবো, কয়েক মাস বা বছর লাগবে। তুমি দুই একটা দিন আমার গাধাটিকে দেখে রাখো। আমি আমার পরিচিত একজন লোককে বলব, সে কাল বা পরশু এসে গাধাটি নিয়ে যাবে।

আমি অবাক হয়ে বললাম, আচ্ছা, কিন্তু আসলে কীজন্য তোমাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে?

ক্রিস্টোফার বলল, এটা বলতে পারবো না তোমাকে। তুমি আমার উপকারটা করো গাধাটিকে দেখে রেখে। এর জন্য যা খরচ হয় তা আমি তোমাকে পাঠিয়ে দেব ঐ লোকের সাথে।

আমি বললাম, আচ্ছা।

ক্রিস্টোফার বলল, শক্তভাবে একে বেঁধে রেখো। তোমাকে বলা হয় নি, আমি ৪৬% নিশ্চিত হয়েছি, এটা ওই গাধার বংশেরই। তাই জেনেটিক্যালি এর মধ্যে সুইসাইড প্রবণতা থাকা অস্বাভাবিক নয়। বিশেষত মালিকের বিচ্ছেদ হলে। আমার অনুরোধ, তুমি একে শক্তভাবে বেঁধে রাখবে।

ক্রিস্টোফারকে নিয়ে পুলিশ চলে গেলো গাড়ি করে।

আর আমি গাধাটিকে নিয়ে এসে আমার বাসার পেছনের একটা জায়গায় বেঁধে রাখলাম।

বিকেলের দিকে গৃহপালিত পশুপাখির খাবারের দোকান থেকে খোঁজ নিয়ে, একটা খামারে গেলাম। সেখান থেকে কয়েকদিন খাবার মত ঘাস কিনে নিয়ে আসলাম।

গাধাটির মুখের নিচে ঘাসগুলি রেখে মনে হলো একটা দায়িত্ব শেষ হয়েছে।

গাধা এখন আরামে ঘাস খাবে। বাঁধা থাকবে। কাল বা পরশু ক্রিস্টোফারের লোক এসে নিয়ে যাবে। ঝামেলা শেষ।

কিন্তু আমার ধারণামতো কাজ হলো না। দেখলাম গাধা কিছু খাচ্ছে না। মন মরা হয়ে বসে আছে।

আমি সন্ধ্যাপর্যন্ত চোখ রাখলাম, কিছু খেতে দেখি নি।

পরে আর দেখি নি। কারণ ভাবলাম ঘাস রাখা আছে মুখের নিচে। পেটে ইঁদুর দৌড় শুরু হলে এমনিতেই খাবে। দুঃখ ক্ষুধা মেরে ফেলে এমন ঘটনা মানুষেই কম দেখা যায়, আর গাধায়!

আমি আমার প্রাত্যহিক কাজেই ব্যস্ত হলাম। রাতে খাওয়াদাওয়ার পর কয়েকটা বিয়ার নিয়ে লেখতে বসলাম। লেখতে লেখতে একটা গল্পের মাঝপর্যায়ে চলে এসেছি, বিয়ারও দুইটা শেষ হয়েছে, রাতও নেমে এসেছে বেশ, এমন সময় আমার কানে একটা শব্দ আসলো। একটা খসখসে গলার ডাক।

মিস্টার হামিদ! মিস্টার হামিদ!

আমি চমকে উঠলাম। কে ডাকে!

লেখা থামিয়ে সতর্কতার সাথে শোনার চেষ্টা করলাম।

মাই গড! বাসার পেছন থেকে শব্দ আসছে।

খসখসে একটা আওয়াজের মত, কিন্তু কথা স্পষ্ট।

মিস্টার হামিদ! মিস্টার হামিদ! আমার গলার দড়ি খুলে দাও। ওরা আমাকে নিয়ে বিক্রি করে দেবে। আমি বিক্রি হতে চাই না। মিস্টার হামিদ! খুলে দাও!

আমি আমার কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না।

উঠে গিয়ে পেছনের বাতিটা জ্বালালাম। অ্যালকোহলের প্রভাবে মাথা সামান্য টলছিল। বেশি না, আমার তখনো পূর্ণ সচেতনতা রয়েছে।

আমি পেছনের জানালা নামিয়ে, গ্লাস দিয়ে দেখলাম, গাধাটা এদিকেই তাকিয়ে আছে। কথা বলছে, তার মুখ নড়ছে।

আমি ভয় পেয়ে গেলাম।

কী করব বুঝতে পারছিলাম না।

গাধাটির কথাবার্তা বাড়তে লাগলো। কাতর ভাবে সে অনুনয় করতে লাগলো। এমন কাতর অনুনয় আমি কখনো শুনি নি।

এক পর্যায়ে, আমি দরজা খুলে বের হলাম। সোজা গাধাটির কাছে চলে গিয়ে, ভয়ে ভয়েই তার গলার বাঁধন খুলে দিলাম।

গাধাটি আমার দিকে জ্বলজ্বল চোখ মেলে তাকাল। স্পষ্ট করে বলল, ধন্যবাদ মিস্টার হামিদ। তোমার মঙ্গল হোক। এরপর শান্তভাবে হেঁটে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল সে।

সমাপ্ত