সব গল্প

১৭ জুলাই, ২০২৬

কয়েকটি খরগোশ

নুরুন্নাহার বানুর ঘটনাটি

আমি কি আমার গল্পটা বলা শুরু করব?

হ্যা, শুরু করুন।

আপনার হয়ত শুনে অবিশ্বাস্য মনে হবে। হয়ত আপনি অন্য কিছুও ভাবতে পারেন আমাকে, যে বাস্তব জ্ঞান আমার লোপ পেয়েছে। কিন্তু আমি সত্যি বলছি যে, যা কিছু আমি বলব আপনার সামনে এগুলি আমি কাউকে বলি নি, এবং এর মধ্যে সত্যতা রয়েছে।

আপনি নির্ধিদ্বায় বলে যান।

আমার নাম নুরুন্নাহার। আপনার এখানে এপয়ন্টমেন্ট নেবার সময়ে যেসব তথ্য আমি দিয়েছি সেখানেই হয়ত আপনি আমার নাম ও ইত্যাকার কিছু তথ্যাদি দেখেছেন। খেয়াল করলে দেখবেন সেখানে আমার নাম দেয়া আছে সালমা বানু। তাহলে কোন নামটি আমার আসল নাম এই প্রশ্ন এসে যায়। আমি সত্যি করে বলছি যে আমার নাম নুরুন্নাহার, আমি নুরুন্নাহার। আমার বয়স পয়তাল্লিশ বৎসর আট মাস এগারো দিন। আমি গত আঠারো বৎসর যাবত এই শহরে বাস করছি। কিন্তু আমার জন্ম এখানে নয়, আমি জন্ম নিয়েছিলাম এক মফস্বল শহরে, কিছু কারণে আমি জায়গাটির নাম আপনাকে বলতে চাই না, মার্জনা করবেন।

ঠিক আছে। এতে কোন সমস্যা নেই।

খুবই উচ্চবংশীয় এক পরিবারে আমার জন্ম। আমাদের পরিবার ঐ অঞ্চলে খুবই প্রভাবশালী ছিল। আমার বিয়েও হয় একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারে।

বিয়ের পর আমি আমার স্বামীর পরিবারে চলে যাই।

অতঃপর একটি অত্যাশ্চর্য ঘটনা আমার জীবনে ঘটে যায়।

আমার স্বামীর বাড়িটি ছিল বিশাল। সামনে বড় পুকুর, পেছনে আম বাগান। সেই আম বাগানের ঝাঁকড়া আমগাছগুলিকে আমার ভালো লাগত। আমি এবং আমার এক বান্ধবী মিলে সেই আম বাগানের শান্ত স্নিগ্ধ পরিবেশেই অধিকাংশ সময় কাটাতাম।

আপনার বান্ধবী?

জি, আমার বান্ধবী। তাকে বিয়ের সময় আমার সাথে দেয়া হয়েছিল পরিবার থেকে। সে আমার সাথে থাকতো। আমাদের বন্ধুত্ব ছিল গাঢ়।

তার নাম কী?

সেটা জানা কি গুরুত্বপূর্ণ?

সবই গুরুত্বপূর্ণ, কিছুই অগুরুত্বপূর্ণ নয়।

তার নাম জোলেখা। জোলেখা বানু। আচ্ছা, আমবাগানের গল্পে চলে যাই। আমি আর আমার সেই বান্ধবী মিলে যখন সেই আম বাগানে সময় কাটাতাম তখন আমরা দেখতে পাই ঝাঁকড়া আমগাছগুলিতে বাস করে অনেক অনেক কাঠবিড়ালী। আমার তাদের ভালো লাগতো। আপনি হয়ত লক্ষ করে থাকবেন কাঠবিড়ালী খুব অদ্ভুত ভাবে তাকায়, যেন তাদের যাদুকরি চাহনির মাধ্যমে তারা আপনার ভিতরে কী খেলা করছে তা ধরে নিতে পারে সহসাই। আমার এমনই মনে হতো, আর তাই তাদের আমার ভালো লাগত।

আর আপনি হয়ত বিশ্বাস করবেন না, সেই আমবাগানের গভীরে আমরা গিয়ে দেখেছিলাম কিছু কাঠবিড়ালী আছে সবুজ হলুদ।

গায়ে লাল নীল ডোরাকাটা অনিন্দ্য সুন্দর একটা কাঠবিড়ালীকে যেদিন আমরা দেখলাম, সেদিন কী বার ছিল আমার মনে নেই, কিন্তু ঐদিন আমার ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। আমার মনে হতে লাগল যে কোন মূল্যে, যে কোন মূল্যে এই কাঠবিড়ালীকে আমার চাই।

আমি এবং আমার বান্ধবী মিলে আম বাগানের গভীরে গিয়ে সেই কাঠবিড়ালীকে তাড়া করলাম।

কাঠবিড়ালীটি যেন আমাদের সাথে খেলা করছিল। সে গাছের ডালে ডালে, পাতার ফাঁকে ফাঁকে না লুকিয়ে থেকে মাটিতে নেমে এলো, এবং আমাদের সামনে দিয়ে দৌড়ে যেতে লাগল। এমন অবস্থা হচ্ছিল যে আমরা প্রায় ধরে ফেলব ধরে ফেলব এমন। আর আপনি নিশ্চয়ই জানেন ধরে ফেলার চাইতে, বা না ধরতে পারা অধরাদের চাইতে, ধরে ফেলব ধরে ফেলব এমন অবস্থাই বেশি মনোযাতনাকর।

এভাবে কীভাবে যেন সারাদিন চলে গেল। এমনিতেই আম বাগানে বেশি সূর্যের আলো প্রবেশ করতো না। সন্ধ্যার দিকে আলো আরো কমে আসলো, এবং আমরা অবসন্ন হয়ে পড়েছিলাম এক অদ্ভুত ও অত্যাশ্চর্য লাল নীল রঙ মাখা কাঠবিড়ালীর পেছনে ছুটতে ছুটতে।

একটা পর্যায়ে ক্লান্ত হয়ে হোঁচট খেয়ে আমি পড়ে যাই। আপনাকে বলা হয় নি তখন আমি অন্তঃস্বত্তা ছিলাম, আমার পেটে ছিল ৫ মাসের সন্তান, সেই সন্তান ঐ পড়ে যাবার ফলে নষ্ট হয়ে যায়।

উল্লেখ্য যে আমি আসলে পড়ে গিয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলি, এবং আমাকে আম বাগান থেকে ধরাধরি করে বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়, এবং ডাক্তার জোনাথন সাহেবকে ডেকে নিয়ে আসা হয়েছিল। তিনি আমার চিকিৎসা করেন।

এরপর আমি শয্যাশায়ী থাকি দেড় মাস। বিছানা থেকে উঠার শক্তি পেতাম না। ডাক্তার জোনাথন সাহেব নিয়মিত আসতেন আমার অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে। আমার কী হয়েছে তিনি ধরতে পারছিলেন না।

আমি খেতে পারতাম না। আমি শুকিয়ে রোগা হয়ে যাচ্ছিলাম।

এবং জোনাথন সাহেব বা অন্য কাউকে আসলে আমি সব বলতেও পারতাম না। কেবল আমার বান্ধবীটিকে বলতাম, আর যেহেতু সে আমার সকলই জানতো তাই তার জানা ও আমার জানায় কোন তফাত ছিল না। সেও অন্য কাউকে বলতে পারতো না যে, আসলে আমার ভেতরে কী ঘটে চলেছে।

একটা অদ্ভুত অবস্থায় আমি পড়ে গিয়েছিলাম। আমি প্রতিরাতে অসংখ্য কাঠবিড়ালী স্বপ্নে দেখতাম। বিভিন্ন রঙের। তারা দৌড়ে যাচ্ছে, তারা লাফাচ্ছে। তারা কখনো মানুষের মত আবার কখনো নেকড়ের মত হাসছে। কখনো শুণ্যে ডিগবাজি দিয়ে অদৃশ্য হয়ে হয়ে আবার ফিরে আসছে মাটিতে। আবার সবার সামনে রানীর মতো আছে সেই লাল নীল রঙ মাখা কাঠবিড়ালীটি, যাকে আমরা দেখেছিলাম আম বাগানে।

আমি বুঝতে পারছিলাম একটা কিছু হয়েছে, এবং একটা জটিল সমস্যার ভেতরে আমি পড়ে গেছি।

ডাক্তার জোনাথন সাহেব অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা করলেন। শেষপর্যন্ত তিন মাস তেরোদিন পরে তিনি বললেন, একটা সমস্যা হয়েছে, সেটি হলো, খুব সম্ভবত নষ্ট হওয়া সন্তানের কোন অংশ বা কিছু একটা ভেতরে রয়ে গেছে। এটি বের করে আনতে হবে জরায়ু দিয়ে।

কীভাবে তিনি এই সিদ্ধান্তে এসেছিলেন বা কীভাবে এটি সম্ভব এই প্রশ্ন আর কেউ করে নি। আমিও না।

আমার মনে আছে যেইদিন তিনি ঐ মৃত সন্তানের ভাঙা অংশ আমার ভেতর থেকে বের করে আনার প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন ঐদিন ছিল মঙ্গলবার। মঙ্গলবার সকালের দিকে তিনি তার কাজ শুরু করেন।

বিকালে কাজ শেষ হয়।

তিনি চারটি কাঠবিড়ালী আমার ভেতর থেকে বের করে নিয়ে আসেন। মানব সন্তানের মত গায়ের চামড়া, গায়ে কোন পশম নেই। আমি স্বচক্ষে দেখি নি, শুনেছি।

এই কথা দাঊদাঊ আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ে। যে আমি কাঠবিড়ালী প্রসব করেছি।

পরিবারের লোকজন এগুলিকে দ্রুত মাটি চাপা দেবার ব্যবস্থা শুরু করে। প্রশাসন থেকেও কিছু লোক আসে দেখতে, সাংবাদিকেরাও আসে। এদের খবরটা আসলে দিয়েছিলেন ডাক্তার জোনাথন সাহেবই। তার ইচ্ছা ছিল গবেষণার জন্য বাচ্চাগুলিকে সংরক্ষণ করা। কিন্তু আমার স্বামী ও তার পরিবার রাজী হচ্ছিলেন না। তখন শেষ চেষ্টা হিসেবে কৌশলে তিনি প্রশাসনের সাহায্য নিতে যান।

ডাক্তার জোনাথন সাহেব একটি বাচ্চাকে নিয়ে যেতে পেরেছিলেন। তিনি কাচের জারে ক্লোরুফর্মের তরলে ডুবিয়ে একটা বাচ্চাকে নিয়ে যান।

আর এদিকে সব দিকে আমার খবরটি প্রচার হয়ে যাওয়ায় আমার স্বামীর পরিবার বিব্রত অবস্থায় পড়ে। পত্রিকাগুলি লিখতে থাকে যে, আমি ও আমার বান্ধবী যখন আম বাগানে যেতাম তখন কোন একটা কাঠবিড়ালী আমার সাথে যৌন সম্পর্ক করে। তারই ফল হিসেবে আমার গর্ভে আসে তাদের সন্তান।

এই বাচ্চাগুলি প্রসব করার পর দুই একদিনের মধ্যেই আমি সুস্থ হয়ে উঠি। পুরনো শক্তি ও সতেজতা ফিরে পাই। সেই স্বপ্নও আর দেখছিলাম না।

কিন্তু পরিবারে বাস করা আমার জন্য অসহনীয় হয়ে উঠে।

আর এদিকে এক তীব্র মনোকষ্ট আমাকে বিহবল করে তুলতে থাকে। আপনার হয়ত শুনতে অদ্ভুত লাগবে, আমি আমার কাঠবিড়ালী সন্তানটিকে দেখতে চাচ্ছিলাম। আমার মনে হচ্ছিল তাকে একবার দেখতে না পারলে আমার বেঁচে থাকা অর্থহীন। হোক না মৃত, তবুও আমি তাকে দেখতে চাই একবার। কেমন করে সে কাচের জারে ক্লুরোফর্মের তরলে ডুবে আছে, যেন ঘুমিয়ে আছে মাতৃগর্ভে।

আমার দিন রাত অসহনীয় হয়ে উঠতে লাগল। এক রাতে আমি ও আমার বান্ধবী বাড়ি থেকে বের হই। আর না ফেরার উদ্দেশ্য নিয়ে এবং যে করেই হোক ডাক্তার জোনাথন সাহেবকে খুঁজে বের করতে ও আমার সন্তানকে দেখতে।

ডাক্তার জোনাথন সাহেবের বাসায় গিয়ে জানতে পারি আমরা, সেদিন সন্ধ্যার ট্রেনে তিনি শহরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছেন। আমরা ভোররাতের ট্রেন ধরি।

পরদিন শেষ বিকেলে আমরা এ শহরে আসি।

এরপর থেকে এ শহরে আছি আমরা।

জোনাথন সাহেবকে আর খুঁজে পাই নি। খোঁজ নিয়ে দেখেছি তিনিও আমাদের এলাকায় আর ফিরে যান নি।

এখন, আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন আমার জীবনের এই ঘটনাকে?

আপনার বান্ধবী জোলেখা বানু কি এখনো আপনার সাথে বাস করেন?

হ্যা, আমরা একসাথে থাকি।

আপনি কি আমাকে পরীক্ষা করতে এখানে এসেছেন?

মানে, কী নিয়ে পরীক্ষা?

পরীক্ষা যে আপনার রূপক গল্প আমি ধরতে পারি কি না?

না, বিশ্বাস করুন, আমি সত্যি বলেছি।

আমি বলছি না আপনি মিথ্যা বলছেন। সত্য ও মিথ্যা জটিল বিষয়। প্লেইনভাবে এদের দেখার সুযোগ নাই যখন মানুষের জীবন এবং বাস্তবতা এর সাথে যুক্ত থাকে। আপনি সত্যই বলেছেন, কিন্তু বলেছেন রূপকে। হয়ত আপনার এই আত্মবিশ্বাস ছিল যে, আমি এটি ধরতে পারবো না।

এরকম কোন ইচ্ছা আমার ছিল না। আমি সত্যিকার অর্থেই সাহায্যের জন্য আপনার কাছে এসেছি। কারণ জীবনে থেমে থেমে নানা সময়ে আমি সেই কাঠবিড়ালীদের স্বপ্নে দেখে আসছি। ইদানীং সেই স্বপ্ন বেড়েছে। এবং এখন আমার মনে হচ্ছে যে, তারা যেন কিছু বলতে চায়। আমি আপনার কাছে এসেছি এই সমগ্র বিষয়টা বুঝতে। কারণ এই জিনিস ব্যাখ্যা দেবার মত বা বুঝানোর মত আর কেউ আছেন বলে আমার জানা নেই।

আপনি যদি সত্যি এখনো এই স্বপ্নের ভেতরে থেকে থাকেন, তাহলে আপনাকে আমি ট্রিটমেন্ট করতে পারি। পর্যায় ক্রমে নিয়মিত কিছু সেশনের ভেতর দিয়ে আপনাকে যেতে হবে। সেগুলি কতদিন ধরে চলবে এ ব্যাপারে নিশ্চিত করে আমি কিছু বলতে পারছি না। এখন আপাতত আমি আপনাকে একটা ওষুধ দিচ্ছি, এটি রাতে ঘুমানোর আগে খাবেন। এবং পরবর্তী যে তারিখ লিখে দিচ্ছি ঐ তারিখে আসবেন। আজ আপনার সময় শেষ।

কিন্তু আমার জীবনের গল্পটি সম্পর্কে আপনি কী বুঝলেন তা তো আমাকে বললেন না।

আমি বুঝে গেছি এটা জানলে আপনার অস্বস্থি হবে না তো?

না হবে না। কারণ আমি নিজেই তো আপনাকে বললাম। আর আপনি বুঝতে পারলেই তো আপনার কাছ থেকে সাহায্য পাওয়া সম্ভব হবে আমার জন্য। সুতরাং, আমার কোনরূপ অস্বস্থি হবে না।

আমি আপনার গল্পটি বুঝতে পেরেছি হয়ত। হয়ত আপনার গল্পের একটা অর্থ এরকম যে আপনার বিয়ে হবার পরে বা আগে থেকেই আপনি বুঝতে পারেন যে আপনি আপনার বান্ধবী জোলেখা বানুকে ভালোবাসেন। এই ভালোবাসা জনিত কারণে আপনাকে নানা অস্বস্থিকর অবস্থায় পড়তে হয়। ভালোবাসার জন্য মানুষ রাজ সিংহাসন ছেড়ে দেয়। আপনি পরিবার ও সমাজ ছেড়েছেন। এটা অবশ্যই ভালো জিনিস, দোষের কিছু নয়। এবং সেই গল্পটিই আপনি আমাকে আজ এভাবে বললেন। কারণ সরাসরি বলা আপনার পক্ষে সম্ভব হচ্ছিল না। কিন্তু…

আর কোন কথা নয় আজ নুরুন্নাহার বানু। আগামীদিন আপনার সাথে কথা হবে। ওষুধ খান। আর যদি সমস্যা তীব্র হয়, অর্থাৎ যদি টের পান কাঠবিড়ালীগুলি আপনার খাটের নিচে চলে আসছে রাতে, বা এদের সাথে যদি গুহিল ও কুম্ভিরেরাও চলে আসে, তখন দ্রুত আমার সাথে যোগাযোগ করবেন। গুড লাক।

জোলেখা বানুর ঘটনাটি

আমার নাম জোলেখা বানু। আমি এক্ষণে, আপনার সম্মুখে এসেছি কারণ আমি জানতে পেরেছি যে নুরুন্নাহার আপনার কাছে এসেছিলেন এবং তিনি কিছু একটা আপনাকে বলেছেন।

– আপনি কি সেই প্রসঙ্গেই বলতে এসেছেন?

সেই প্রসঙ্গেই, তবে আমি আমার সমস্যা নিয়ে বলতে আসছি। এবং আমার কাহিনী বলতে গেলে নুরুন্নাহারের কাহিনীও আসবে, কারণ আমার কাহিনী তার সাথে যুক্ত, যেমন আমিও তার জীবনকাহিনীর সাথে জড়িত। আপনি কি বিষয়টা বুঝতে পারছেন?

– হ্যা, আঁচ করতে পেরেছি। নুরুন্নাহার তার গল্পে বলেছিলেন আপনারা একইসাথে ছিলেন কোন একটা মফস্বলে, এবং এরপর একসাথেই শহরে…

আপনি প্রথমে আমার কথা শুনুন শুরু থেকে। আপাতত নুরুন্নাহারের গল্প আপনাকে ভুলে যেতে আমি অনুরোধ করছি।

– ঠিক আছে। বলুন।

আমার জন্ম এক সাধারণ কৃষক পরিবারে। আমার বাবা ও মা ছিলেন দরিদ্র। তারা একদিন জঙ্গলাকীর্ণ রাস্তায় হাঁটতে গিয়ে, রাত্রি নিশাকালে, যেদিন আকাশে আধখানা চাঁদ উঠেছিল, সেই দিন মাটিতে জ্বলজ্বল ফুটে থাকা এক পাখির বাসায় শিশু আমাকে পেয়েছিলেন বলে কথিত আছে। এর সত্য মিথ্যা আমি জানি না, কিন্তু এই গল্প ঐ অঞ্চলের অনেকেই বিশ্বাস করে থাকেন।

আমার বাবা বাহাদুর খান সাহেবের বাড়িতে কাজ করতেন, এবং সেই সুবাধেই ছোটকাল থেকে আমি খান সাহেবের বিরাট বাড়িতে যেতাম। সেখানেই খান সাহেবের ছোট মেয়ে নুরুন্নাহারের সাথে আমার পরিচয় ও বন্ধুত্ব।

খান সাহেবের এই মেয়ে ছোটকাল থেকেই অন্যদের থেকে আলাদা ও অদ্ভুত। কাচের বয়ামে ভরে ভরে সে অনেক অনেক ঝিকিমিকি রাখতো, যেগুলি মধ্য রাত্রে তাদের রঙ বদলাতো, এ আমি স্বচক্ষে দেখেছি।

আমাদের বন্ধুত্ব খুবই গাঢ় ছিল। আমরা একসাথে খেতাম, গোছল করতাম, ঘুরতে যেতাম ও নুরুন্নাহার তার সব অদ্ভুত গল্পাদি আমার সাথে করতো এবং আশ্চর্যের বিষয় হলো সে আর কারো সাথে তেমন কোন কথা বলতো না।

নুরুন্নাহারের বিয়ে হয় একজন উকিলের সাথে, যার নাম গুরুদয়াল চৌধুরী, যিনি সর্বাবস্থায় তার কোর্ট কাছারি ও বই পুস্তক নিয়ে ব্যস্ত থাকতে ভালোবাসতেন, এবং খরগোশ পুষতেন।

নুরুন্নাহারের সাথে তার স্বামীর বাড়িতে আমাকেও পাঠানো হয়, খান বাড়ির নিয়ম হিসেবে। ফলত, বিয়ের পরেও নুরুন্নাহারের সাথে আমার অন্তরঙ্গ সম্পর্ক অক্ষুন্ন থাকে।

– এই সম্পর্ক কি কোনভাবে যৌন সম্পর্ক ছিল?

আমি তা বলব না। আমার গল্পে আপনি যা বুঝার বুঝবেন যৌন সম্পর্ক বলতে কী বুঝানো হচ্ছে, ও তার ব্যাপ্তী কতটুকু ধরা হচ্ছে, এর উপর নির্ভর করে আমাদের এই বিষয়টাকে বিচার করতে হবে বলে আমার ধারণা। অনেক সময় স্পর্শ কিংবা চাহনিও যৌন হয়ে উঠতে পারে, এবং প্রায়শই হয়ে উঠে, যেগুলি আক্ষরিক অর্থে সরাসরি যৌন কি না আমি জানি না।

– সেরকম কিছু কি আপনাদের মধ্যে ছিল?

এই ব্যাপারে আমার মধ্যে আগে যেমন সংশয় ছিল এখনো তা রয়েছে। আমি আমার দিক থেকে যতোটা বুঝেছি আমাদের সম্পর্ক ছিল সহজ স্বাভাবিক ও মধুর। এই তিন শব্দের বাইরে অন্য কিছু দিয়ে আমি এই সম্পর্ককে প্রকাশ করতে পারি না।

– ছিল বলছেন?

হ্যা ছিল।

– তার মানে এখন নেই?

সেজন্যই তো আপনার কাছে আসা। তা না হলে হয়ত আপনার কাছে আসতে হতো না, এবং যে সমস্যায় আমি পড়েছি এর কোন অস্তিত্ব থাকতো না। যাইহোক, আমি আমার কাহিনীতে ফিরে যাই।

– যান।

নুরুন্নাহার তার স্বামীর ঘরে বেশ ভালোই ছিল, আমাকে সাথে নিয়ে। বাড়ির পেছনে বড় এবং গাঢ় একটি আম বাগান ছিল। গভীরের দিকে এই বাগানের আমগাছগুলি ছিল অনেক প্রাচীন, প্রায় শতাধিক কাল সম্ভবত একেকটার বয়স। আমি ও নুরুন্নাহার এই আম বাগান পছন্দ করতাম। আমরা এর ভেতরে, গভীর থেকে গভীরে গিয়ে সভ্যতার গোপন সব শব্দাবলী এবং দুর্বোধ্য সব মন্ত্রের উচ্চারণ যেন শুনতে পেতাম। আমাদের ভালো লাগতো সেই পরিবেশ।

সেই আম বাগানে অনেক খরগোশ ছিল। আমি ও নুরুন্নাহার প্রায়ই খরগোশদের তাড়া করতাম। একদিন খরগোশদের তাড়া করতে করতে আমরা বাগানের খুব গভীরে চলে যাই। শুনশান নিরবতার মধ্যে। আমরা অনেক অনেক অনেক খরগোশ দেখতে পাই ভেতরে। আর দেখতে পাই শামসুজ্জামান নুরুকে, যে আমার এই কাহিনীর এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র, তখন তার বয়স ছিল দেখতে পঁচিশ বছরের মতো।

খালি গায়ে, হাতে লাঠি নিয়ে বসে সে খরগোশদের রাখালী করছিল, গভীর আমবাগানে।

সেদিন আমাদের অল্প কথাবার্তা হলো।

শামসুজ্জামান বলল সে এই বাগানে আসে অনেক দূর হতে, খরগোশদের দেখভাল করা তার গুরুদায়িত্ব। প্রতিদিন আমরা যে খরগোশদের তাড়া করি এটা সে জানে। অনেকদিন থেকে আমাদের সে পর্যবেক্ষণ করে আসছে।

প্রথমদিন কথা বলে শামসুজ্জামান নুরুকে আমার অমায়িক লাগল। আমরা অল্পক্ষণ কথা বলে চলে আসলাম।

এরপর দিন থেকে আমি নুরুন্নাহারের মধ্যে একটা পরিবর্তন দেখতে পাই। সে যেন উদাস উদাস। আমার সাথেও ঠিকমতো কথা বলে না। এবং মাঝে মাঝে কোথায় যেন উধাও হয়ে যায়, এবং আমি তাকে খুঁজে পাই না।

দিনে দিনে তার উধাও হওয়া বাড়তে লাগলো। আমি দেখলাম প্রতিদিনই দীর্ঘ সময় ধরে নুরুন্নাহার যেন অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে, বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে।

নুরুন্নাহার যখন নাই হয়ে যেত তখন আমি নানা স্থানে তাকে খুঁজতে থাকতাম। সম্ভাব্য যেসব স্থানে সে থাকতে পারে।

এমনই একদিন খুঁজতে খুঁজতে আমি আম বাগানে ঘুরছিলাম। হঠাত নীলাভ বর্ণের একটি খরগোশ আমার সামনে এসে লাফাতে থাকে। যেন সে আমাকে আহবান করছে তাকে ধরতে। একে ধরতে গিয়ে আমি বাগানের খুব গভীরে প্রবেশ করি, এবং শামসুজ্জামান নুরু ও নুরুন্নাহারকে আবিষ্কার করি, তারা পরস্পর নগ্ন হয়ে পরস্পরের ভেতরে প্রবাহমান। এমন অবস্থা দেখে আমি গায়ে একটা শিহরন অনুভব করলাম।

নুরুন্নাহার ও নুরু দুজনই একসময় আমার উপস্থিতি টের পায়। তারা আমার দিকে তাকিয়ে হাসে ও আমাকে আহবান করে।

তারা বলে তোমার জন্য আমরা অনেক অপেক্ষা করেছি। আমাদের ধারণা ছিল তুমি নিজ থেকেই আমাদের খুঁজে পাবে। কিন্তু পেলে না। তাই আজ একটা খরগোশকে পাঠাতে হলো।

নুরুন্নাহার ও নুরু আমাকে তাদের মধ্যে টেনে নিয়ে গেল। তারা বললো, ত্রি ধারা স্রোত সব সময় সঠিক সমুদ্রে মিলিত হয়।

আমার মধ্যে দ্বিধা ও অস্বস্থি কাজ করছিল। কিন্তু বাগানের সেই পরিবেশে, সেই নিরবতা ও প্রাচীন গন্ধময়তাযুক্ত বাতাসে আমি আর আমার ভেতরে রইলাম না।

এই শুরু হলো, এবং এভাবেই চলছিল আমাদের দিন। আমার, নুরুন্নাহারের ও শামসুজ্জামান নুরুর।

তারপর একদিন নুরুন্নাহারের স্বামী গুরুদয়াল জিনিসটা খেয়াল করলেন, এবং সমস্ত কিছু তিনি জেনে ফেললেন হুট করেই।

আমার ধারণা, তিনি খরগোশদের কাছ থেকেই ব্যাপারটা সম্পর্কে অবগত হন। আগেই বলেছি তার পোষা খরগোশেরা ছিল, এবং খরগোশদের সাথে তাই তার একটা সুসম্পর্ক বিদ্যমান ছিল।

আর এদিকে নুরুন্নাহার অন্তঃস্বত্তা হয়ে পড়ে।

গুরুদয়াল চৌধুরীর পরিবার এটি মেনে নিতে পারে না। এই বাচ্চাকে নষ্ট করার ব্যবস্থা করা হয়।

সেই কাজটি করেন একজন ডাক্তার, যার নাম জোনাথন।

তিনি সমস্ত প্রক্রিয়া শেষে বলেন যে, নুরুন্নাহার একটি নীল খরগোশ প্রসব করেছে।

গুরুদয়াল চৌধুরী ও তার পরিবার বাচ্চাটিকে মাটি চাপা দিতে চাইলেন।

কিন্তু কৌশলে জোনাথন সাহেব সাংবাদিক ও প্রসাশনকে খবরটি জানিয়ে একটা বিশৃঙ্খলা তৈরি করে, ক্লুরোফর্মের কাচের জারে বাচ্চাটিকে ভরে এলাকা ছেড়ে নাই হয়ে যান। তার উদ্দেশ্য ছিল রয়াল সোসাইটির কাছে এই আশ্চর্য বস্তুকে প্রদর্শন করা ও এ সংস্লিষ্ট গবেষণার পথ সুদৃঢ় করা।

নিজের বাচ্চাকে খুন করা হয়েছে বা সরিয়ে ফেলা হয়েছে, এটি জানার পর নুরুন্নাহার উদভ্রান্ত হয়ে যায়। সে বাড়ির সমস্ত জিনিসপত্র ভাঙতে থাকে এবং অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতে শুরু করে গুরুদয়াল ও তার পরিবারকে।

নুরুন্নাহারকে খুবই শক্ত দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়।

গভীর রাতে আমি সেই দড়ি কেটে তাকে মুক্ত করি, এবং আমি ও নুরুন্নাহার সেই রাতেই শামসুজ্জামান নুরুর খোঁজে আমবাগানের ভেতরে প্রবেশ করি।

আমবাগানের খুব গভীরে আমরা নুরুকে পাই, সে একটি ধবধবে শাদা বাঁশি হাতে বসেছিল।

নুরুন্নাহার তাকে সমস্ত বিষয় খুলে বলে।

এতে তার কোন বিকার হলো বলে আমার মনে হলো না।

এরপর, একরকম জোর করে নুরুন্নাহার শামসুজ্জামান নুরুকে নিয়ে, ও আমাকে নিয়ে তার বাচ্চাকে খুঁজে বের করতে শহরের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমায়।

-শহরে আসার পর আপনারা বাচ্চাকে খুঁজে পেয়েছিলেন বা জোনাথন সাহেবকে?

না, এখনো পাই নি।

– আপনারা তিনজন একসাথেই থাকতেন?

হ্যা, আমরা একসাথেই থাকতাম এতোদিন। কিন্তু খুবই অদ্ভুত ঘটনা যে, এই গত সপ্তাহে শামসুজ্জামান নুরু হারিয়ে গেছে। সে আর বাসায় ফিরে আসছে না।

– এটাই কি আপনার সমস্যার কারণ?

হ্যা, এই কারণে নুরুন্নাহার আবার উদভ্রান্তের মতো আচরণ শুরু করেছে। শামসুজ্জামান নুরু মায়াহরিণের মত তার রঙ বদলাতে পারে। আমার ধারণা সে একটা কিছু করবে এই শহরে।

– সেই একটা কিছু কী?

সেটি আমি বুঝতে পারছি না। এই না পারার দরুণ আমার ভেতরে নানা রকম উদ্বিগ্নতা ভর করেছে। আমি ঘুমাতে পারছি না। দিনরাত একেকটা ভয় এসে আমাকে তাড়া করছে। আর এদিকে নুরুন্নাহারের অবস্থাও খারাপ।

নুরুন্নাহার আমাকে পর্যন্ত অবিশ্বাস করা শুরু করেছে। তার এমন ধারণা হচ্ছে যে, আমি শামসুজ্জামান নুরুকে লুকিয়ে রেখেছি।

সেই ছোটকাল থেকে একটি নীল কাচের বয়াম ছিল নুরুন্নাহারের কাছে। তাতে ঝিকিমিকি পোকা। নুরুন্নাহার কেবল আমাকে সেই বয়াম ও বয়ামের ভেতরের পোকাদের রঙবাহার দেখতে দিত। কিন্তু নুরু হারিয়ে যাবার পর বা অদৃশ্য হয়ে যাবার পর, আমাকে দিচ্ছে না।

আমার এও মনে হচ্ছে নুরুন্নাহার বা নুরু আমাকে হত্যার পরিকল্পণা করছে। আমি দু চোখ বন্ধ করে ঘুমাতে পারি না। চোখের পাতা বন্ধ করলেই দেখতে পাই নুরুন্নাহার ছুরি হাতে এগিয়ে আসছে বা নুরু দা হাতে এগিয়ে আসছে। তাই চোখ খোলা রাখতে হয় আমার। এই করতে করতে আমার চোখ ফুলে গেছে।

– আপনি কি কোন আওয়াজ শুনতে পান?

হ্যা, অনবরত একটা খসখস আওয়াজ। ভিজে মাটিতে চটি পায়ে কেউ হেঁটে যাচ্ছে এমন আওয়াজ। লতানো উদ্ভিদযুক্ত ঘন বনে মুষলধারে পড়ন্ত বৃষ্টির আওয়াজ। ফিস ফিস ফিস ফিস আওয়াজ। মধ্যরাতে নাম না জানা অভদুত ভীতিজাগানিয়া এক পাখির আওয়াজের মত আওয়াজ, অস্ফুট। এসব আমি শুনতে পাই। সকল সময়ে শুনতে পাই। আমার মনে হচ্ছে আমি তলিয়ে যাচ্ছি। আমি মরে যাচ্ছি। এমন অবস্থায় আমি বেঁচে থাকতে পারব না। আপনার কাছে আমি এসেছি সমাধানের জন্য।

আপনার কথা শুনে আমার যা মনে হচ্ছে, আপনি স্কিজোফ্রেনিয়ায় ভুগছেন। ভয় পাবার কোন কারণ নেই। আমি ওষুধ দিচ্ছি। এগুলি নিয়ম করে খাবেন। তাহলে ভয় দুশ্চিন্তা এগুলি থাকবে না।

আর আরেকটি কথা আমি আপনাকে বলতে চাই, কাহিনিটি বলার সময়ে বলতে পারি নি, একদিন রাত্রে আমি বাইরে ছিলাম ও নুরুন্নাহার এবং নুরু ভেতরে ছিল ঘরের। বাইরে থেকে আমি ঘরে প্রবেশ করি, এবং হালকা পায়ে বেডরুমের দিকে যাই। গিয়ে দেখতে পাই, আপনি বললে বিশ্বাস করবেন না…

– আচ্ছা, আজ আপনার সময় শেষ। আগামী দিন এ ব্যাপারে কথা হবে। আর কথা নয়।

আপনি বিশ্বাস করুন…আমি যা দেখেছি…আমি দেখলাম বিছানায় দুটি খরগোশ…শাদা ধবধবে ও পরস্পরের ভেতরে প্রবাহমান…বিশ্বাস না হয়, আমি…আমি আপনাকে মোবাইলে দেখাতে পারব…আমি রেকর্ড করেছিলাম সেইদিন…

– আরেকদিন। আজ আমার সময় নেই। আপনি আসুন।

কিন্তু আপনি…

– আসুন আপনি। ওষুধগুলি ঠিকমতো খাবেন। আরেকদিন কথা হবে।

শামশুজ্জামান নুরুর গল্প

দাদাবাবু আমি আপনার কাছে বড় আশা নিয়া আসছি। আমি জানি যে এই তল্লাটে কেবল আপনিই আছেন আমারে হেল্প করতে পারেন। আমি, আমার মনে হইছে দাদাবাবু, আমার জীবন সায়াহ্নে এসে গেছি। আমার মনে হইছে যে ওরা আমারে মাইরাই ফেলবে। আমার যাওয়ার কোন জায়গা নাই। আমি ভয়ে ভয়ে দিনাতিপাত করতেছি দাদাবাবু। আমার কিছু নাই আজ, আমার কেহ নাই। আমি আপনার কাছে আসছি বাঁচার জন্যে। আপনে কি আমারে…

আপনার নাম কি শামসুজ্জামান নুরু?

জি জি, আমার নাম…তবে আমার নাম শাসশুজ্জামান নুরু।

শামসুজ্জামান?

না না, শামশুজ্জামান। আমার পিতার নাম শামশির জাতক। আমি তার একমাত্র ছেলে শামশুজ্জামান নুরু। আপনি নিশ্চয়ই আমার কথা শুনছেন, আমি যতটুকু জানতে পারছি, ওরা আসছিল আপনার কাছে। দাদাবাবু, আপনি ওদের কথা কতটুকু বিশ্বাস করছেন আমি জানি নে, কিন্তু আমারো বলার মত অনেক কথা আছে। যেইগুলি আপনি জানতে পারলে হয়ত আমার অবস্থা বুঝতে পারবেন ও আমাকে একটা সমাধান দিতে পারবেন। সেই আশাতেই আমি…

আপনি আপনার কাহিনী শুরু করুন। সময় বেশি নেই।

জি, আমি, আমার পিতার নাম তো আগেই বলেছি। শামশির জাতক। তিনি ছিলেন গুরুদয়াল চৌধুরীর পিতা জনাব আখলাক চৌধুরীর একজন সাধারণ কর্মচারী। জায়গা জমির হিসাব তিনি রাখতেন। সেই সুবাধে আমার চৌধুরীদের বাড়িতে গতায়ত ছিল।

আচ্ছা।

আপনি নিশ্চয়ই চৌধুরীদের পুকুরের গল্প শুনেছেন। চৌধুরীদের বাড়ির সামনে বিশাল এক পুকুর ছিল। দাদাবাবু, সকল সময় সেই পুকুরে সবুজ শেওলা ভরে থাকত। আর আপনি এই কথা জানেন কি না আমি জানি না, ঐ পুকুরে কেউ নামত না ভয়ে। কারণ গুরুদয়াল চৌধুরীর মাতা জনাবা হাফেজা বেগম এক চন্দ্রগ্রস্থ রাতে নীল কাপড় পরিধান করে সেই পুকুরে ঝাঁপ দিয়াছিলেন। তিনি আর ওঠেন নাই। পরদিন সকালে সারা পুকুরে জাল টানা হইলেও তিনি উঠে আসেন নাই। এরপর চৌধুরীরা বড় বড় পাম্প আনয়ন করে পুকুর সেঁচা শুরু করেন, তিন দিন তিন রাত্র সেঁচার পরে পুকুরের তলানি দেখা যায়, কাদা কাদা। সমস্ত কাদাপানি খোজা হয়, গণ্ডায় গণ্ডায় মানুষ নামে খুঁজতে। কিন্তু হাফেজা বেগমরে পাওয়া যায় নাই। না জিন্দা না মুর্দা। সেই থেকে দাদাবাবু, ঐ ঘাটে কেহ নাহি না যায়। ভয়ে।

আচ্ছা।

চৌধুরীদের বাড়ির পেছনে ছিল ঘন আমবাগান। আমার কাজ ছিল সেই আম বাগানে। আমি বাগানের বৃক্ষরাজিদের দেখাশোনা করতাম। গরমের দিনে ঐ পুকুর থেকে জল আনয়ন করে বৃক্ষাদির মূলে প্রক্ষেপনের ছলে মাটিতে ফেলে দিতাম। তাদের কতটুকু বৃক্ষদের শেকড়ে পৌছাইত, তাহা আমি আজো জানি নে।

তবে আশা করি যথেষ্ট পরিমাণে জল তারা পাইত। এই কারণে পানির অভাবে কোন গাছই মারা যায় নাই আমার হিশাবে।

কিন্তু দাদাবাবু, একদিন আমি একটা আশ্চর্য ঘটনা দেখতে পাই।

কী ঘটনা?

গুরুদয়াল চৌধুরী নুরুন্নাহার বানুকে যেদিন বিয়া করেন, এবং নুরুন্নাহার ও জোলেখা বানু যখন চৌধুরীদের বাড়িতে আসে, এর এক সপ্তাহ পরে।

আমি দেখতে পাই একটি আম গাছের চারা শুকাইয়া মরে গেছে। খুবই আশ্চর্য এই ঘটনা। কারণ এমন কখনো হয় না।

এরপরে, আমি পরপর কয়েক সপ্তাহে এমন ঘটনা দেখতে পাই। দেখতে পাই যে, আম বাগানের গহীনের দিকে একটা গাছ, দুইটা গাছ করে মরে শুকাইয়া যাইতেছে। চারা গাছগুলা। আমি যথেষ্ট পানি দিতে শুরু করছিলাম। তাও এই দশা হইতে লাগল।

তারপর?

আপনারে দাদাবাবু আমি আগে বলছি আমার বাপের কথা। আমার বাপ তখন বুড়া হইছেন। বিছানা থেকে উঠতে পারেন না এমন।

সারাজীবনের অভিজ্ঞতায় তার ভেতরে অনেক জ্ঞান ছিল নানা পৃথিবীর। দৃশ্য অদৃশ্য।

তিনি যখন আমারে দেখলেন বিমর্ষ, তখন জিজ্ঞাস করলেন আমার হইছে কী। আমি তারে সবিস্তারে বললাম আম বাগানে আচানক চারা গাছগুলির মইরা শুকাইয়া যাওয়ার কথা।

বাপ আমার নিরব হইলেন। তিনি অল্প কাশলেন। তার মুখে ও কপালে আমি দেখলাম চিন্তার ছায়া। তিনি আমারে বললেন, এইটা ভালো লক্ষণ নয় হে বাছাধন, ভালো লক্ষণ নাহি হয়। এইরকম ঘটনা আগে একবার ঘটছিল যখন গুরুদয়াল চৌধুরীর মা হাফেজা বেগম অদ্ভুদ সব কার্যাবলী শুরু কইরা দিছিলেন।

আমি আমার বাপরে জিজ্ঞাস করলাম, কী সেই অদ্ভুত ঘটনা যা হাফেজা বেগম শুরু করছিলেন।

আমার বাপ কিছু বললেন না এই ব্যাপারে। তিনি খুক খুক কইরা কাশলেন। অনেক সময় নিয়া ভাবলেন। তারপর বললেন আমারে, বাপ, তুমি ঐ বাগানে আর যাইও না। আমি হিসাব কইরা দেখলাম হাফেজা বেগমের সময়ে যা হইছিল, সেইরকম আরেকটা কিছু হইবার সময়ই এখন। যারা আগমনী বার্তা দিছিল তাদের আসার সময় হইছে এখন। এইগুলা বেশ ঝামেলার। তোমার ইচ্ছা হইলে বাপধন, তুমি অন্য কোন জায়গায় যাও গিয়া। তবে আমি জোর করি না। কারণ জিন্দেগী থেকে পলানো যায় না। এবং এইসব ঘটনারাশি থেকে পলানো অসম্ভব। অনেক অনেক মহাজাগতিক হিসাবের পরে এগুলা ঘটে। এবং এইসব ঘটনার কুশীলব বৃন্দ নির্ধারিত হয় ঐ জটিল হিসাবের পরম্পরায়, সম্ভাব্যতার আচানক সব রাহস্যিক তৎপরতার দ্বারা।

আমি বাপের কথা কিছুই বুঝলাম না তেমন। যেরকম তার আরো অনেক কথা আমি বুঝতাম না। তবে তার কথা যে গুরুতর কিছু এইটা আমি বুঝতে পারছিলাম।

আর আরো বুঝতে পারলাম যেইদিন বিকালে, অন্ধকার গহীন আমবাগানে আমি দুইটা বৃহৎ ময়াল সাপরে দেখি, পরস্পর জড়াজড়ি করে তারা কামকলার চর্চা করে যাইতেছে। দেখে আমি বিস্মিত হইলাম কারণ এত বড় সর্পরা এই বাগানে কীভাবে আসলো, এবং এই অদ্ভুত কামলীলায় তারা এখানে মত্ত কেন।

তবে দাদাবাবু, আমি কিছুই আপনার কাছে লুকাব না। সেই সর্পদের কামলীলা দেখতে দেখতে, বিশ্বাস করেন দাদাবাবু, আমি জানি না কেন যেন আমার ভেতরে একটা পাশবিক শক্তির অনুভূতি আমি টের পাইতে লাগলাম। আমি টের পাইলাম আমার বাড়া মহাশয় ফুলে ফেঁপে আইফেল টাওয়ারের আকৃতি ধারণ করতে উদ্যত।

এবং একটা চুম্বকীয় আকর্ষণ যেন ঐ ময়াল সর্পদ্বয়ের লীলাখেলায়। আমি চোখ না ফেরাইয়াই রইলাম, আর হস্তমৈথুন করতে শুরু করলাম ঐ জায়গাতেই। আর যখন আমার বীর্য উর্বরা ধরনীপৃষ্টে পতিত হইল ঠিক তখনই দাদাবাবু, ময়াল সর্পদ্বয় মাথা ঘুরাইয়া আমার দিকে তাকাইল। তাদের জ্বলজ্বল চোখ।

এরপর আমি নারী কন্ঠের অদ্ভুত হর্ষপূর্ণ শব্দমালা শুনতে পাই।

আমার মাথা ঘুরাতে থাকে। জ্ঞান হারানোর আগে আমি দেখতে পাইতেছিলাম যে, ময়াল সর্পদ্বয় দুইটা রমনীতে রূপান্তরিত হয়েছেন।

দাদাবাবু আপনি নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন এরা কারা? নুরুন্নাহার ও জোলেখা বানু, একেবারে খালি গাত্র, নগ্ন।

আচ্ছা। তারপর?

তারপর দাদাবাবু আমার বিপদের শুরু। এটা বললে মিথ্যা বলা হবে যে, উল্লিখিত দুই রমনীর নগ্ন রূপ দেখে আমি আকৃষ্ট হই নাই। কিন্তু সেই আকর্ষণ এত তীব্র ছিল না যে আমি তাদের প্রেমে পড়ে যাব।

প্রথম প্রথম কয়েকদিন গহীন আমবাগানে আমিই অপেক্ষা করতাম। তারা আসতো, এবং আমাকে আমন্ত্রণ করতো তাদের সাথে কামলীলায়।

কিন্তু, এইভাবে কিছুদিন চলার পরে একটা পর্যায়ে আমি বুঝতে পারি আমি এদের খেলার পুতুলে রূপান্তরিত হয়ে গিয়েছি। তাদের কথামতো আমাকে আসতেই হতো। এবং এই দুজনের মধ্যে এত সব অদ্ভুততা ছিল যে আমি এদের বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। এছাড়া, গুরুদয়াল চৌধুরীর সাথে আমার ছোটকাল থেকেই ভালো সম্পর্ক ছিল। তিনি আমাকে ছোটভাইয়ের মত স্নেহ করতেন।

আমি চাইলাম এখান থেকে বের হতে। আমি তাদের বললাম আমার মনোবাসনার কথা। কিন্তু এই দুই নারী আমাকে বের হতে দিলো না।

আপনি নিশ্চয়ই শুনেছেন এর পরে কী হলো।

নুরুন্নাহার গর্ভবতী হয়ে যায়। কিন্তু বিশ্বাস করুন দাদাবাবু, ঐ সন্তান আমার নয়। কারণ আমি কখনোই নুরুন্নাহারের যোনিতে আমার বাড়া দেই নাই। এইটা আপনার কাছে অবিশ্বাস্য মনে হইতে পারে, কিন্তু এইটাই সত্য দাদাবাবু।

নুরুন্নাহার গর্ভবতী হবার পরে সবাইকে জানাল, এবং অত্যাশ্চর্য ব্যাপারটা হলো গুরুদয়াল চৌধুরীও একইভাবে কখনো নুরুন্নাহারের যোনিগর্তে স্বীয় বাড়া প্রবেশ করান নাই বলে জানতেন। ফলে এই বাচ্চা কার বা কীভাবে নুরুন্নাহার গর্ভবতী হলো এ নিয়ে সংশয় দেখা দেয়।

শেষতক যখব ব্যথা উঠে তখন জোনাথন সাহেবকে আনা হলো। জোনাথন সাহেব জানালেন অদ্ভুত কীসব জিনিস প্রসব করেছে নুরুন্নাহার। এই কথা জানাজানি হবার পরে জোনাথন সাহেব ওই বস্তু নিয়া উধাও হয়ে গেলেন।

আর এদিকে নুরুন্নাহার ও জোলেখা বানু আমার কাছে আসলো। আমাকে নিয়ে রাতের অন্ধকারে বের হলো জোনাথন সাহেবকে খুঁজতে। এরপর থেকে আজ পর্যন্ত তারা জোনাথন সাহেবকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। আর আমাকে কয়েদ করে রেখেছে।

কয়েদ করে? আপনি নিজ ইচ্ছায়…?

না না দাদাবাবু। আমার কখনো ইচ্ছা ছিল না। এরা আমাকে জোর করে রেখেছে। দাদাবাবু আপনি হয়ত জানেন ফেমডমের কথা, এরা আমার উপর এইসব করে বেড়াচ্ছে, কিন্তু এগুলিতে আমার আগ্রহ নাই। আমি তো এদের পছন্দ করি না। আমি পালাতে চাই। কিন্তু নানা ভাবে তারা আমাকে আটকে রাখছে। তারা আমাকে মেরে ফেলবে।

কেন মেরে ফেলবে?

দাদাবাবু, আমি তাদের অনেক কথা জানি। আমি জানি যে তারা রাতে রাতে ময়াল সাপ হয়ে যায়। আমি জানি যে একটি কাচের জারে রাখা অদ্ভুত সব রশ্মির সাহায্যে তারা কীসব কথাবার্তা বলে, এবং রাতের আধারে তখন সমস্ত রুমের ভেতরে অলৌকিক সব রঙ নেমে আসে। বিশ্বাস করেন দাদাবাবু, এইগুলা সব সত্যি কথা। আমি নিজ চোখে দেখেছি। এবং ওরা আমাকে মেরে ফেলবে। আপনি আমাকে বাঁচান।

হুম। ঠিক আছে। আমি আজ আপনাকে একটা ওষুধ দিচ্ছি। এটা রাতে খাবেন। পরবর্তী এপয়ন্টমেন্টের সময় ও তারিখ আপনাকে ফোন করে জানানো হবে।

কিন্তু দাদাবাবু আমার যে আরো অনেক কথা বাকি ছিল, জোনাথন সাহেবের সাথে আমার যে দেখা হয়েছিল, এবং ঐ বস্তুটা…

আজ আর না শামশুজ্জামান। অন্যদিন।

কিন্তু দাদাবাবু…

আজ আর নয়। এখন চলে যান। পরবর্তী এপয়ন্টমেন্টের বিষয়ে আপনাকে জানানো হবে।

গুরুদয়াল চৌধুরীর গল্প

আমার লাঠিটা কি এই জায়গায় রাখতে পারি?

পারেন।

থ্যাংক ইউ। আমার নাম…আপনি হয়ত আঁচ করতে পেরেছেন। আমার নাম গুরুদয়াল চৌধুরী। এই বৃদ্ধ বয়েসে দেখেন কী একটা ঝামেলায় পড়ে…যাইহোক এটা কোন ব্যাপার না। জগত সকল সময়েই রহস্যময়, এবং কতো রহস্য ও অদ্ভুত জিনিস আছে চারপাশে তা আপনার মতো আর কে জানে…হে হে হে।

আপনি জানেন।

হ্যা, তা বলতে পারেন। হে হে হে। অল্প বিস্তর আমি জেনেছি। ছোটকাল থেকেই এটা আমার নেশা। সকল অদ্ভুত জিনিসের প্রতি। তবে এই নেশাটার পেছনে একটা গল্প আসলে আছে, যেটি হলো কারণ। আমি অনেক ভেবে, সূত্র মিলিয়ে বুঝতে পেরেছি পরে। আমার গল্প সেখান থেকেই শুরু করি তাহলে?

করেন।

আপনি কি আগ্রহ পাচ্ছেন? এই যে ওরা এসেছে আপনার কাছে, কয়জন এসেছে আমি জানি না, তবে এসেছে সে খবর আমার কাছে আছে, আপনি কি আগ্রহ পাচ্ছেন।

পাচ্ছি। আপনি বলে যান।

গল্পটা অনেক আগের। আমার বাবা আখলাক চৌধুরীর মা সালেহা চৌধুরীর একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখেছিলেন। তিনি দেখলেন এক অমাবস্যার আকাশ ফুঁড়ে বেরিয়েছে চাঁদ আর ছুটে এসে চৌধুরী বাড়িতে ঢুকে গেছে।

এই অদ্ভুত স্বপ্নের ব্যাখ্যার জন্য তিনি স্বপ্ন বিশারদদের আনালেন। তাদের প্রায় সবাই বললো যে খুবই ভাগ্যবান চৌধুরী বাড়ি। চৌধুরী বাড়িতে এমন সন্তান জন্ম নিবে যে বংশের মর্যাদা আরো আরো বাড়িয়ে তুলবে।

কেবল একজন স্বপ্ন বিশারদ সেখানে ছিলেন, একজন পন্ডিত ব্যক্তি। তিনি শুধু বললেন, এই স্বপ্নের ব্যাখ্যা এমন না। স্বপ্নটি অদ্ভুত। চৌধুরী বাড়িতে খুবই বিস্ময়কর কিছু ঘটনা ঘটবে যার রেশ বহুদিন পর্যন্ত রয়ে যাবে।

বলাবাহুল্য এই পন্ডিতের মত গ্রহণযোগ্য হয় নি। এবং তিনি কোন প্রকার পুরস্কারও পান নি। তাকে একরকম তাড়িয়েই দেয়া হয়েছিল।

এই স্বপ্নের কিছুকাল পরে আমার বাপ আখলাক চৌধুরীর জন্ম নয়। স্বাভাবিক নিয়মেই তিনি বড় হন, ও বিয়ে করেন আমার মা হাফেজা বেগমকে। তিনি উচ্চবংশীয়া মহিলা ছিলেন।

কিন্তু বিয়ের পরেই তার আচরণে অদ্ভুততা দেখা দেয়। মাঝে মাঝেই তিনি আমাদের বাড়ির পেছনের আম বাগানে হারিয়ে যেতেন।

এমনো হয়েছে একদিন দুইদিন তাকে খুঁজে পাওয়া যায় না। পরে আম বাগানে পাওয়া যায়।

সার্বক্ষণিক দাস দাসীদের পাহাড়ার ব্যবস্থা করেও তাকে ঘরে রাখা যেত না। তিনি হারিয়ে যেতেন। হারিয়ে যাবার এক অদ্ভুত ও অলৌকিক ক্ষমতা নিয়ে তিনি যেন জন্মেছিলেন বা তার উপর ভর করেছিল সেই আশ্চর্য ক্ষমতা।

আপনি কি আমার মায়ের মৃত্যুর ঘটনাটি জানেন?

পুকুরে?

জি হ্যা। উনি এক রাতে, সেদিন আকাশে বড় চাঁদ উঠেছিল, ঐদিন আমাদের পুকুরে ডুবে যান। আর উঠে আসেন নি। এটা আমার জন্মের একমাস পরে।

উনি কেন আত্মহত্যা করেছিলেন এ ব্যাপারে আপনার কোন মত আছে?

আমার হিসাব বলে, তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন আমার কারণে। আমার জন্মের পরে একটা সামাজিক চাপের মুখে তাকে পড়তে হয়, কারন আপনি তো জানেন আমার কোমড় থেকে নিচ পর্যন্ত মানুষের মতো না।

তাহলে?

খরগোশের মত, আমি কি আপনাকে আমার পা দেখাব?

না তার দরকার নেই। আপনি বলে যান।

হ্যা, যা বলছিলাম। আমার মায়ের মৃত্যুর ঘটনাটি, এবং আমার এইরূপে জন্ম নেয়া আমাকে রহস্যের প্রতি চির আগ্রহী করে তোলে।

প্রাথমিক ভাবে আমি জগতের অনেক অদ্ভুত রহস্যের বিষয়ে জেনেছিলাম আমাদের পারিবারিক এক কর্মচারী কবিরাজ শামশির জাতকের কাছে। এই কবিরাজের একটি ছেলে ছিল, নুরু।

শামশুজ্জামান নুরু?

হ্যা, শামসুজ্জামান নুরু।

উনি বলেছেন তার নাম শামশুজ্জাম্মান, শামসুজ্জামান নয়।

আরে একটা হলেই হলো। শামশু আর শামসুতে কী তফাত! নামই তো।

আচ্ছা।

হ্যাঁ, এই নুরু। এও আপনার কাছে তাহলে এসেছে। এর প্রতি আমার মনোভাব কিন্তু খুব একটা ভালো না। কারণ আমার স্ত্রীকে ফুঁসলিয়ে সে ভাগিয়ে নিয়ে গেছে।

আমি বিয়ে করেছিলাম একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারে। আমার স্ত্রী নুরুন্নাহারের সাথে আপনার কথা হয়েছে নিশ্চয়ই। সুন্দরী মহিলা। তার সাথে দেয়া হয়েছিল জোলেখা বানুকে। সেও সুন্দরী। আপনি হয়ত তাকেও দেখে থাকবেন।

এরা কিন্তু খুবই সরল মনের ছিল। দুনিয়ার প্যাঁচ তারা বুঝত না। আর এদিকে শামসুজ্জামান নুরু তার বাপের কাছ থেকে অনেক জাদুকরি চাল শিখে নিয়েছিল। ওগুলি দিয়েই সে এই দুই নারীকে সে বশ করে।

আর আরেকটি ব্যাপার…আপনার কাছে কিছু লুকানো ঠিক না…তাই আমি বলতে চাই…

বলুন।

আমার নিচের যে অবস্থা, মানে কোমড়ের নিচ থেকে খরগোশের মত, এই জন্য একটা হীনম্মন্যতা আমার মধ্যে কাজ করতো। আমি তাই কখনো আমার স্ত্রীর সামনে নিচের অংশ অনাবৃত করি নি। একরকম ভয় ও দ্বিধায়। আমি ভেবেছিলাম যে, কোনভাবে আমি আমার নিচের অংশকে স্বাভাবিক মানুষের মত করে ফেলার ওষুধ বের করে ফেলব এবং এরপরে আমি তার সামনে যাব। কিন্তু সেই সময় আর পেলাম না। তার আগেই নুরু…সে কিভাবে কাজটা করেছে তাও আমি পরে বুঝতে পেরেছি।

কীভাবে?

তার বাপ বিভিন্ন লতাপাতা দিয়ে একটা ওষুধ বানাতে জানতেন। এটা সে শিখে নিয়েছিল। খুবই অদ্ভুত সে ওষুধ। একবার খেলে যৌনশক্তি অনেক বেড়ে যায়। আপনি বিশ্বাস করতেও পারবেন না। আমিও বিশ্বাস করতাম না। একবার খেয়েছিলাম, এবং এরপর আমার বাড়ির দাসীদের অনেকে তিন চারদিন হাঁটতে পারে নি, আমি বড়াই করছি না, এটা সত্যি কথা।

আচ্ছা।

যাই হোক, নুরুর মাধ্যমে আমার স্ত্রী যখন অন্তঃস্বত্তা হয়েছিল তখনো আমি কিছু মনে করি নি। কিন্তু জোনাথন সাহেব জানালেন বাচ্চা হয়েছে খরগোশের, তখনই আমার মাথা ঘুরে গেল। আমি বুঝতে পারলাম এখানে কেবল নুরু নয়, আরো কিছু রহস্য আছে, যার শুরু আমার দাদীর স্বপ্ন থেকে, এবং আমার জন্ম ও আমার মায়ের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে যে রহস্য প্রবাহিত।

জোনাথন সাহেবকে আমি বললাম এই কথা কাউকে না জানাতে।

কিন্তু চতুর জোনাথন অনেককে জানিয়ে একটা হুলস্থুল তৈরি করে, খরগোশের বাচ্চাটি নিয়ে পালিয়ে গেলেন।

আমি মরিয়া হয়ে তাকে ধরতে লোক পাঠালাম। এদিকে ব্যস্ত থাকায় বুঝতেই পারলাম না কখন নুরু, নুরুন্নাহার ও জুলেখাও পালিয়ে গেছে।

এখন আপনি কীজন্য এসেছেন আমার কাছে?

আপনার কাছে মানুষ যে জন্য আসে, রহস্যের সমাধান পেতে। জীবনের জন্য সমাধান পেতে। আমি কিন্তু আজো মীমাংসা করতে পারি নি এটি কী হয়েছিল, এবং এই রহস্যের হেতু কী?

এমন কী হতে পারে না যে আপনার স্ত্রীর গর্ভে মানুষের বাচ্চাই হয়েছে আর জোনাথন সাহেব মিথ্যা কথা বলেছেন। আপনি কি স্বচক্ষে খরগোশের বাচ্চা দেখেছেন জন্মাতে?

না, নিজ চোখে দেখি নি। আমি কালো একটা জিনিস দেখেছি যা কোনভাবেই মানুষের বাচ্চা নয় এটা আপনাকে নিশ্চিত করে বলে দিতে পারি। আর জোনাথন সাহেব কেন এই মিথ্যা বলবেন? তার এখানে লাভ কী?

মানুষের কোথায় কী লাভ, এর সবটা কি আমরা বুঝতে পারি গুরুদয়াল সাহেব? আপনি তাহলে ওদের খুঁজেই বেড়িয়েছেন সারাজীবন। এবং আমার কাছেও এসেছেন এদের খুঁজে। তাই নয় কি?

সারাজীবন বলা ঠিক হবে না। অনেক সময়। আমার জানার অদম্য ইচ্ছা যে আসলে এর পেছনে রহস্যটা কী। এর অর্থ কী। আমার ধারণা তারা জানে। তবে আমি এর পেছনে সারাজীবন ব্যয় করি নি কারণ অর্ধেক জীবন আমি ব্যয় করেছি আমার নিম্নাবস্থা অর্থাৎ কোমড়ের নিচের অংশ স্বাভাবিক করার ওষুধ বের করে। গত তিন বছর আগে এক সাধুর সাহায্যে আমি তা করতে স্বক্ষম হই।

অর্থাৎ, আপনি নিচের অংশ স্বাভাবিক মানুষের মত করতে পেরেছেন?

জি পেরেছি। যে তীব্র মনোবেদনা আমার ছিল, আমার মনে হচ্ছিল নিচের অংশকে স্বাভাবিক করতে পারলে তা কমে যাবে। কিন্তু তা কমে নি। কারণ আমি এই ধাঁধাটা মীমাংসা করতে পারছিলাম না। আমার দাদীর স্বপ্নের অর্থ আসলে কী, এবং এরপরে যা যা ঘটলো তা কেন ঘটলো।

আমি নিজ থেকে একটা ব্যাখ্যা অবশ্য দাঁড় করিয়েছি কিছু প্রমাণের উপর ভিত্তি করে।

আচ্ছা, সেটি আরেকদিন শুনব। আজ আর নয়। আপনাদের সবার গল্প শুনে আমার বিষয়টা ইন্টারেস্টিং মনে হচ্ছে এবং আমি অন্যভাবে এটি সমাধানের কথা ভাবছি। সেটি কীভাবে?

তা এখনো জানি না। আমি ফোনে আপনার সাথে যোগাযোগ করব এ ব্যাপারে। আজকের আলাপ এখানেই শেষ হোক। কিন্তু আমার ব্যাখ্যাটি শুনলে হয়ত আপনি আরো কিছু বুঝতে পারতেন?

না, আর শুনব না। যতটুকু দরকার ছিল ততটুকু শোনা হয়ে গেছে। গুরুদয়াল চৌধুরী আপনি আসুন, আগামী দিন দেখা হবে। ওকে, বিদায়।

বিদায়।

জোনাথন সাহেবের গল্প

আমার নাম রবার্ট। রবার্ট সাত্রিয়ানি। কিন্তু আমি একসময় পরিচিত ছিলাম জোনাথন সাহেব নামে। পেশায় আমি একজন ধাত্রী। সন্তান প্রসবকালে যিনি সাহায্য করে থাকেন। আপনি কি জানেন সক্রেটিসের মা একজন ধাত্রী ছিলেন?

না, এটা আমার জানা ছিল না।

যাই হোক, আপনি আপনার কাছে এসেছি একটা বিশেষ প্রয়োজনে। আপনি নিশ্চয়ই আমার কথা শুনে থাকবেন। ওরা আমার কথা কী বলেছে আমি জানি না। আমারো একটা গল্প আছে। সেটা বলতে আমি আপনার কাছে এসেছি। এবং আপনার সাহায্য নিতে।

তাহলে শুরু করুন।

ধাত্রীবিদ্যা আমার পৈত্রিক পেশা। আমার পিতার নাম জিমি সাত্রিয়ানি। আমার পূর্বপুরুষেরা ইংরাজদের সাথে এদেশে এসেছিলেন। আপনি কি আমার নাম শুনে ভেবেছিলেন আমি শাদা চামড়ার লোক হব?

আমি আগে থেকে কিছু ভেবে রাখি না।

বেশিরভাগ লোকই ভেবে রাখে। তারা জোনাথন সাহেব নাম শুনে ভাবে শাদা চামড়ার ইংরাজ দেখবে। কিন্তু আমার গায়ের রঙ কালো।

আমার পূর্বপুরুষেরা ধাত্রীবিদ্যায় খুবই ভালো ছিলেন, তাই হয়ত ইংরাজরা তাদের একজনকে নিয়ে এসেছিল এদেশে। আমি ঠিক জানি না। আমি এই পেশায় এসেছি আমার পিতার মাধ্যমে। এবং আমার যখন খুব অল্প বয়েস তখন আমার পিতা গত হন, এবং আমি তার কাজগুলি দেখতে শুরু। আর তখন থেকেই চৌধুরী পরিবারের সাথে আমার জানাশোনা।

আমার বাবা কিছু ডাক্তারি বিদ্যা শিখেছিলেন। ফলে সাধারণ অসুখ বিসুখে মানুষ তার শরণাপন্ন হতো। বাবার মৃত্যুর পর তারা আমার কাছে আসতে শুরু করে। বাবার কাছ থেকে আমি চিকিৎসার অনেক বিষয় শিখেছিলাম। এছাড়া ব্যক্তিগত আগ্রহের কারণে দুষ্প্রাপ্য বই সংগ্রহ করেও আমি শেখতাম। এটা আমার নেশা ছিল।

এলাকার সবচাইতে প্রভাবশালী পরিবার চৌধুরীরা। আমার বাবার সাথে তাদের অত্যন্ত সদ্ভাব ছিল। আমার সাথেও হয়। আমার চিকিৎসা জীবনের শুরুতেই একটা জটিল সমস্যায় আমি পড়ে যাই এই চৌধুরী বাড়িতেই। আপনি আমার কথা শুনছেন তো?

হ্যা, আমি শুনছি। আপনি বলে যান।

গুরুদয়াল চৌধুরীর মা হাফেজা বেগমের সমস্যা দেখা দেয়। এমন জিনিস আমি আগে কখনো দেখি নি।

তিনি মাঝে মাঝেই যেন উধাও হয়ে যেতেন। তাকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যেত না।

এছাড়া, প্রতি পূর্ণচন্দ্রের রাতে তিনি চৌধুরী বাড়িত সামনে ঘুরে ঘুরে নাচতেন।

আকাশের দিকে মুখ করে তাকিয়ে, চাঁদের দিকে তাকিয়ে অদ্ভুত অঙ্গভঙ্গি করে নানাকিছু বলতেন।

তার অবস্থা দেখে আমার ভয় শুরু হলো। কারণ তখন আমার বয়েস কম আর এমন জিনিস আমি কল্পনাও করি নি। কম বয়েসে এমন হওয়া অস্বাভাবিক নয়, কী বলেন?

হ্যা, ঠিক। বলে যান।

গুরুদয়াল চৌধুরীর বাবা আখলাক চৌধুরী বিভিন্ন জায়গা থেকে বড় বড় কবিরাজদের আনালেন। কিন্তু কেউ কোন সুরাহা করতে পারলো না। কোন ঝাড় ফোঁক বা ওষুধে কাজ হলো না।

আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে, ভদ্রমহিলার উন্মাদগ্রস্থতার সাথে চাঁদের কোন গভীর সম্পর্ক আছে।

এরপর গুরুদয়াল চৌধুরীর জন্ম হলো। ধাত্রী হিসেবে তখন আমিই ছিলাম।

গুরুদয়াল কি তার কোমড় থেকে নিচ পর্যন্ত যে অন্যরকম ছিল সে কথা বলেছেন?

হ্যা।

সেটাও এক বিস্ময়কর ঘটনা ছিল আমার জন্য। এবং এর প্রায় এক মাস পরেই গুরুদয়াল চৌধুরীর মা তাদের বাড়ির সামনের পুকুরে ডুবে হারিয়ে যান। তার মৃতদেহ পাওয়া যায় নি। আরো আশ্চর্য ব্যাপার হলো সমস্ত পুকুরের পানি সেঁচা হলেও সেখানে মাছ বা কোন প্রাণীর দেখা মিলে নি।

এবং আপনি জানেন কি না জানি না, ঐ পুকুরটাতে রাত বিরাতে লাল নীল নানা রঙের ঝিকিমিকি আলোর রশ্মি দেখা যেত প্রায়ই। এসব কথা কি আপনি আগে শুনেছেন ওদের কাছে?

কিছু কিছু শুনেছি। আপনি আপনারটা বলে যান।

গুরুদয়ালের পরিবারকে এলাকার অনেকেই মনে করতো অভিশপ্ত। একসময় তারা প্রতাপশালী জমিদার ছিল। এবং অনেক খারাপ কাজ তারা করেছেন এমন বলা হতো। সেই জন্যই অভিশাপ লেগে তাদের এই অবস্থা।

আমি আগেই আপনাকে বলেছি দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থদের প্রতি আমার আগ্রহ ছিল অনেক। আমার বাবার সংগ্রহে এরকম অনেক বই ছিল। বেশিরভাগই চিকিৎসা নিয়ে। আমি সেগুলি পড়তাম। এরকমই একটা বহু পুরনো বই পড়তে পড়তে আমি এমন একটা ঘটনার কথা পাই, যার সাথে গুরুদয়াল চৌধুরীদের পরিবারের মিল যেন খুঁজে পাই। সেই গল্পটা বলব নাকি?

প্রয়োজন মনে হলে বলুন। গল্পটা না বলি। সেটা, ঐ অদ্ভুত ঘটনাটি ঘটেছিল অনেক অনেক বছর আগে। স্কটল্যান্ডের একটা কৃষক পরিবারে।

ওই বিষয়টি পড়ার পরে আমি পরবর্তী সূত্রের জন্য অপেক্ষা করতে থাকি। বইয়ের বর্ণনা মতে আমি হিসাব করে বুঝতে পারি গুরুদয়াল চৌধুরীর স্ত্রীর মাধ্যমে একটা নির্দিষ্ট সময়ে ঘটনাটি ঘটবে।

আমি অধীর আগ্রহ নিয়ে বসেছিলাম। এবং প্রতি সপ্তাহে একবার হলেও গুরুদয়াল চৌধুরীদের বাড়িতে যেতাম কোন কাজ না থাকলেও।

তারপর একদিন আমার ডাক এলো। হুট করেই গুরুদয়ালের স্ত্রীর প্রসব ব্যথা উঠেছে।

ঐদিন আমি প্রস্তুত ছিলাম না। বিশেষ কোন ঘটনার কথা মনেও ছিল না। আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। গুরুদয়াল চৌধুরীর লোকেরা এসে যখন ডাকলো, তখন অন্য কিছু না ভেবে ভাবলাম গুরুদয়ালের স্ত্রীর প্রসব ব্যথাই উঠেছে, তাড়াতাড়ি যেতে হবে। গেলাম।

কিন্তু যখনই আমি প্রসবিত বস্তুটি দেখলাম, তখন আমার সারা গা কেঁপে উঠল। আর আমার মনে পড়ে গেল এতো বছর ধরে আমি এই ক্ষণের অপেক্ষাতেই ছিলাম। এটাই ছিল আমার হিসাব এবং অত্যাশ্চর্য পুরনো বইটির কাহিনীকে সত্য করে দেয়ার মুহুর্ত। আমার গা কাঁপতে লাগলো। প্রথমে আমি কিছুক্ষণ বুঝতে পারছিলাম না কী করব।

ঘরে কেউ ছিল না।

গুরুদয়াল চৌধুরী ঘরে প্রবেশ করতেই আমি বস্তুটিকে আমার চটের ব্যাগে ঢুকিয়ে নিলাম। আর তাকে বললাম, তার স্ত্রী খরগোশের বাচ্চা প্রসব করেছেন।

গুরুদয়াল এক কথায় মেনে নিলেন। তিনি বললেন, এটাকে মাটি চাপা দিতে হবে আজই, আপনি কাউকে বলবেন না।

আর এদিকে গুরুদয়ালের স্ত্রী নুরুন্নাহার চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করে দিলেন। তার চোখ দিয়ে যেন আগুনের ফুলকি বের হচ্ছিল।

আমার সাথে একজন সহকারী ছিল। আমি তার মাধ্যমে কয়েকজন লোককে খবর পাঠালাম এই বলে যে, গুরুদয়ালের স্ত্রী খরগোশের বাচ্চা প্রসব করেছে।

এই কথা দ্রুত ছড়িয়ে গেল। আপনি তো বুঝতেই পারছেন এসব কথা কতো দ্রুত ছড়ায়। গুরুদয়ালের বাড়ি লোকে লোকারণ্য হয়ে উঠল।

আর এই সুযোগে আমি আমার চটের ব্যাগটি নিয়ে পালিয়ে আসি।

কেন আপনি এটি নিয়ে আসলেন?

আমার ইচ্ছা ছিল রয়েল সোসাইটির সামনে এটিকে উপস্থাপন করার। আপনি বুঝতে পারছেন কত বড় জিনিস এটি?

না।

এটি হলো সেই জিনিস যার মাধ্যমে এক মহাবিশ্ব থেকে আরেক মহাবিশ্বে ভ্রমণ করা যায়। আরেক মহাবিশ্বের স্বত্তারা এটি নুরুন্নাহারের মধ্য দিয়ে এই পৃথিবীতে এনেছে। যার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল গুরুদয়াল চৌধুরীর দাদীর স্বপ্নের মধ্য দিয়ে বা আরো আরো আগে থেকে। সেই প্রক্রিয়া আস্তে আস্তে এসে সম্পন্ন হয়েছে অনেক পরে, নুরুন্নাহারের মাধ্যমে।

আর আরেকটা ব্যাপার, আপনি কি লক্ষ করেছেন এই নুরুন্নাহার, জোলেখা বা নুরু বা গুরুদয়ালের মধ্যেকার অস্বভাবিকতা?

তাদেরকে শুরু থেকেই নির্বাচিত করা হয়েছে। সম্ভবত তাদের জন্মের আগে থেকে তাদের নির্বাচন করা হয়েছে। এবং তারা একটি বিশেষ কাজকে সমাধান করে চলেছে, এবং করবে।

সেই কাজ কী?

সেই কাজ কী আমি জানি না। কিন্তু আমার উদ্দেশ্য ছিল এই বাক্সটি বিজ্ঞানীদের হাতে পৌছানো। বিজ্ঞানীরা পেলে এটি ব্যবহার করে বিভিন্ন মহাবিশ্বে মানুষের ভ্রমণ হয়ত সম্ভবপর হয়ে উঠত। এবং আপনি কি মনে করেন ভিন মহাবিশ্বের স্বত্তারা, যারা ভর করেছে নুরুন্নাহার নুরু জোলেখা বা গুরুদয়ালের উপরে, যারা কোন ভয়ংকর উদ্দেশ্য ছাড়া এখানে এসেছে? তাদের যে শক্তি, ক্ষমতা সে অনুপাতে মানুষের কিছু নেই। সুতরাং, তারা যেকোন রকম ভয়ংকর কাজ করতে পারে।

আচ্ছা, আপনি কীভাবে নিশ্চিত হলেন যে, ভিন মহাবিশ্বের নির্বাচিত লোকদের মধ্যে আপনি একজন না। আমার জানামতে সবচেয়ে বেশি সময়কাল ধরে এই বস্তুটি আপনার কাছেই রয়েছে?

হ্যা, তা ঠিক বলেছেন। আমার কাছেই রয়েছে। আমি রক্ষা করে চলেছি এটাকে। আমি রক্ষা করে চলেছি, এটাই প্রমাণ করে আমি ওদের কেউ না। আমি আলাদা।

আলাদা মানেই যে আপনি মানুষের দলে তার কি কোন প্রমাণ আছে?

তা নেই। কিন্তু তা মনে করা যায়। কারণ আমার দ্বারা মানুষের কোন ক্ষতি কখনো হয় নি। আমি ওদের হাত থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছি এত দিন ধরে। এখন আমার মনে হয়েছে, আপনিই আমাকে সাহায্য করতে পারবেন।

এমন মনে হবার কী কারণ?

ঐ দুষ্প্রাপ্য প্রাচীন বইতে এমন লেখা ছিল। আপনার মত একজনের কথা। যার মাধ্যমেই সকল রহস্যের শেষ হয়।

এটা ভুল বললেন সাত্রিয়ানি। রহস্য কখনো শেষ হয় না। আমার মাধ্যমে তো নয়ই।

কিন্তু এছাড়া আমার কোন উপায় তো নেই। বইয়ের সব ইঙ্গিত আপনাকেই যেন নির্দেশ করে। আমি আপনাকে কালো বাক্সটি দেখাতে চাই এখন।

সাত্রিয়ানি সাহেব, এখন আমি বাক্সটি দেখব না। আজ আর সময় নেই। আপনি বরং আগামী মঙ্গলবারে আসুন। কিন্তু বাক্সটি দেখলে আপনি দেখতে পেতেন কেমন প্রাণবন্ত এটি, শুনতে পেতেন এর হৃদস্পন্দন। দেখতে পেতেন কেমন লাল নীল আলোক রশ্মি বের হয় এর মধ্য থেকে। এটি হয়ত আপনাকে সমস্ত ব্যাপারকে বুঝতে সাহায্য করবে। আপনি একবার দেখুন প্লিজ?

না সাত্রিয়ানি। আপনি আসুন। মঙ্গলবারে কথা হবে।

মীমাংসা

আসতে পারি স্যার?

সামাদ?

জি স্যার। আপনি কি ব্যস্ত?

হ্যা, একটা বই পড়ছি। ইন্টারপ্রিটেশন অব ড্রিমস।

অনেকক্ষণ ধরে স্যার পাঁচটা খরগোশ গেইটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।

হ্যা, আমি ভুলে গিয়েছিলাম। গেইট খুলে দাও। ওদের ভিতরে নিয়ে আসো। তারপর আমার কথামতো কাজ করবে। কারণ আমি এখন বই পড়া থেকে উঠতে পারব না। …

স্যার, নিয়ে আসছি।

ওরা কী করে?

রুমের মাঝখানে বৃত্তাকারে ঘুরছে। একেকটা খরগোশ স্যার বেশ বড় সাইজের।

ঠিক আছে। তুমি আলমাড়ির চার নাম্বার তাক খুলো। পি৩২০ এক্স ফাইভ লেজিয়ন পাবে। পেয়েছো?

জি স্যার।

লোড করা আছে। পাঁচটাকে কাছে গিয়ে শুট করো।

এখনই?

যা বলছি তা করো। কথা না।

জি স্যার।

করেছি স্যার।

মারা গেছে?

মনে হয় যাচ্ছে স্যার। উপরের দিকে ট্যাং দিয়ে পড়ে আছে। এবং কোন রক্ত বের হয় নি।

নড়ছে?

না নড়ছে না।

তাহলে আবার আলমাড়ি খুলো। তৃতীয় তাকে বড় নীল রঙের পলিথিন ব্যাগ পাবে। ওতে পাঁচটাকে ভরে ফেলো। আর আজ সন্ধ্যার আগেই এদের পুড়িয়ে ফেলবে নিয়ে। এখনই নিয়ে পুড়িয়ে ফেলবে।

ঠিক আছে স্যার।

সন্ধ্যার আগে আগে যেন সব কাজ শেষ। সন্ধ্যার আগে না পুড়াতে পারলে ঝামেলা।

বুঝতে পারছি স্যার।

আলমাড়ির দ্বিতীয় তাকে কেরোসিনের ড্রাম আছে। ওটা নিয়ে যাও। আগুন লাগাতে সাহায্য হবে।

জি স্যার।

সন্ধ্যার আগে আগে আমাকে এসে রিপোর্ট দিবে। মাথায় রেখো, সন্ধ্যার আগে পুড়াতে যদি না পারো বড় ঝামেলা হয়ে যাবে। ঠিক আছে স্যার। কিন্তু এরা আসলে কারা?

সব কিছু জানতে নেই সামাদ। সব রহস্যের সমাধান হয় না। এবং এটাই সৌন্দর্য। রহস্যের সমাধান হয়ে গেলে জীবন যাপন কেমন নিরস হয়ে উঠত। যাও সামাদ, যাও। সময় বেশি বাকি নেই আর।

সমাপ্ত