সব গল্প

১৯ জুলাই, ২০২৬

কাপ্রিতে মৃত্যু বিষয়ে

এই বিষয়ে আমি লিখব কি না দ্বিধায় ছিলাম কিন্তু যখন দেখলাম আমাদের এক বর্ষীয়ান এবং বিজ্ঞ লেখক একেবারে সূফী দার্শনিক পন্থায় ব্যাপারটাকে দেখছেন আর ইবনে আরাবির ওয়াহদাত আল উজুদ এর ধারণাটি সামনে এনে ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে চেয়েছেন তখন আমার মনে হলো কিছু একটা লেখা দরকার, অন্তত আমি যতটুকু জানি এবং আমার যা মনে হয়।

একথা বলার অপেক্ষা রাখে না কাপ্রিতে মৃত্যু একটা অসাধারণ বই; যে মূল্য ও সমাদর বইটি পেয়েছে ও পাচ্ছে বিজ্ঞ পাঠকদের কাছ থেকে, সাহিত্য সমালোচকদের কাছ থেকে, তা নিজ যোগ্যতার বলেই। বইটি নিয়ে আমি লিখিত আকারে এর আগে কখনো মন্তব্য করি নি, তাই এস্থানে বলে রাখি, বইটি আমার পড়া শ্রেষ্ঠতম এক সাহিত্যকর্ম। এই লেখাটিতে বইটির নানা প্রসঙ্গ অবশ্যই আসবে কারণ যে জটিলতায় আমরা পড়েছি, সম্ভবত আমাদের সাহিত্যের সবচাইতে জটিল এক সমস্যা, সেই সম্পর্কে বলতে গেলে বইটির কাহিনী তো অবশ্যই, এর সাহিত্যমানের ও লেখার ধরনের আলাপও অত্যন্ত জরুরি।

কাপ্রিতে মৃত্যু'র কাহিনী রোমান সম্রাট টাইবেরিয়াসের জীবনের একটা সময় নিয়ে। টাইবেরিয়াস নিজের প্রাণ শঙ্কায় রোম থেকে সরে গিয়ে কাপ্রি দ্বীপে তখন বসবাস করছেন। সেখান থেকে তিনি সাম্রাজ্য চালাচ্ছেন। চারপাশের কাউকে বিশ্বাস করতে পারছেন না ফলত মৃত্যু ভয় থেকে দূরে থাকতে কাপ্রিতে তার জীবন ছিল উদ্দাম উন্মত্ত সুখের, বা সুখ অন্বেষণের, এখানে সুখ বলতে বুঝাচ্ছি প্লেজার। বইতে টাইবেরিয়াসকে দেখানো হয়েছে এমন একজন প্যারানয়েড এবং প্রায় উন্মাদ ব্যক্তির চরিত্রে যিনি সুখের সর্বোচ্চ সীমায় আরোহণ করতে চান। বইটিতে দেখা যায় টাইবেরিয়াসের অদ্ভুত যৌনাচার, এবং নানাবিধ সুখ প্রচেষ্টার বিস্তারিত বর্ণনা। লেখক এখানে পাঠককেও টাইবেরিয়াসের যাত্রায় অংশীদার করতে সচেষ্ট হয়েছেন, পাঠকের কাল্পনিক জগতে সেই চিত্র সরবরাহ করে। বইটির যে সমালোচনা রক্ষণশীল পাঠক ও সমালোচকদের থেকে দেখা গেছে তা এইসব যৌনচিত্রের বর্ণনার জন্যই, তারা এই অংশকে অশ্লীল হিসেবে দেখেছেন।

কাহিনী এগুতে থাকলে দেখা যায় টাইবেরিয়াস দুনিয়ার ক্ষমতাধর একজন ব্যক্তি এবং সুখের প্রায় প্রত্যেক উপকরণ সামনে নিয়েও হতাশায় ভুগেন, এবং একটা পর্যায়ে তিনি সুখভোগের কর্মকাণ্ড করতে থাকেন একধরনের নিরর্থবাদী ভাবলেশহীনতা থেকে। এই সময়ে তিনি খুন হন।

তার খুনের পরে কাহিনী একটি রহস্যজট খুলতে থাকা উপন্যাসের রূপ ধারণ করে। কাপ্রির প্রাসাদে অবস্থানকারী তার নাতি জার্মেনিয়াস, কালিগুলা, এবং তার গার্ডের প্রধান ম্যাক্র তিন জনের উপরেই পাঠকের সন্দেহ যাবার কারণ তৈরি করা হয়। কালিগুলার দিকে সন্দেহ যাবার কারণ সবচাইতে বেশি। তার বাবা মা ভাইকে খুন করিয়েছেন টাইবেরিয়াস। কালিগুলা এই হত্যার প্রতিশোধ নিতে চায়।

গার্ডের প্রধান ম্যাক্র টাইবেরিয়াসের বিশ্বস্ত ছিল, কিন্তু বিভিন্ন সময়ে কালিগুলার প্রতি তার পক্ষপাতিত্ব দেখা যায়। এর কারণ সে একটি মেয়েকে ভালবাসত, যার নাম অলিভিয়া, তাকে রক্ষিতা করে রেখেছিলেন টাইবেরিয়াস।

টাইবেরিয়াসের নাতি জার্মেনিয়াসের দিকে কোন কারণ দেখা না গেলেও, তাকে উচ্চাকাঙ্ক্ষী হিসাবে দেখানো হয়েছে, যে টাইবেরিয়াসের নিয়ন্ত্রণে থাকতে চায় না।

এই তিন সন্দেহজনক খুনির ভেতর থেকে কে খুন করেছে, নাকি টাইবেরিয়াসের প্রিয় রক্ষিতা অলিভিয়া তাকে খুন করেছে, নাকি তিনি আত্মহত্যা করেছেন, নাকি এখানে অলৌকিক কোন ঘটনা ঘটেছে এটা বের করতে নামেন টাইবেরিয়াসের চিকিৎসক হ্যারড রুফো।

গ্রিক মহাজ্ঞানী হার্মিস ট্রিসমেগিস্টাসের চিন্তাধারার একনিষ্ঠ ভক্ত হ্যারড রুফো, এবং তার ভৃত্য প্লুটোর আলাপচারিতা ও কর্মকাণ্ডের মাধ্যমেই বাকি কাহিনী এগিয়ে যায়। যদিও ইতিহাসের কাহিনীর উপর নির্ভর করে মূল কাহিনী, কিন্তু লেখক উপন্যাসের স্বাধীনতা নিয়েছেন। হুবহু ইতিহাসের বর্ণনা করে যান নি। ফলে ইতিহাসের ঘটনার সাথে বইয়ের গল্পে অনেক অমিল রয়েছে।

এই বইয়ের অভিনব উপকরণ নিয়ে আলোচনা শুরু করলে বলে শেষ করা যাবে না। এই স্থলে স্থান সংকুলানের বিষয় রয়েছে, ফলে বই ও তার উপকরণ, নানা রূপক এবং ঐতিহাসিক উপাদান নিয়ে অন্য সময় লিখব বলে ঠিক করেছি, এখানে মূল সমস্যাটার দিকেই মনোযোগ দেই।

হাসানুর রহমান লেখক হিসেবে কেমন তা বিজ্ঞ পাঠকেরা জানেন, আমার নতুন করে বলার কিছু নেই। বছর দশেক আগে আমার সৌভাগ্য হয়েছিল তার প্রতিবেশী হিসেবে বসবাস করার। সেই সময়ে আমি তার জীবনাচার দেখেছি। একজন মহান লেখকের জীবন আমাদের কল্পনায় যেমন, হাসানুর রহমানের প্রাত্যহিক জীবন এর চাইতে ব্যতিক্রম ছিল না। জাগতিক খ্যাতির মোহ তাকে কোনদিন স্পর্শ করতে পেরেছে বলে আমার মনে হয় নি। তিনি নিরালে থাকতে পছন্দ করতেন।

তার যে কয়টি বই প্রকাশিত হয়েছে, এর মধ্যে প্রায় সবগুলাতেই রাজনৈতিক উপাদান আছে। তিনি অনেক হালকা উপন্যাস লিখেছেন। তার ভেতরে আমি সব সময় একটা অতৃপ্তি লক্ষ্য করেছিলাম, তিনি মনে করতেন তিনি যা লিখেছেন তা না লিখলেও হতো। নিজের লেখা নিয়ে কথা বলতে পছন্দ করতেন না। আমার এই কথার প্রমাণ আপনারা পাবেন, তার দেয়া যে অল্প কয়টা সাক্ষাৎকার আছে, কোথাও তিনি তার লেখা নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেন নি। প্রশ্ন এড়িয়ে গেছেন।

অকাল্ট বা হার্মেটিসিজমের প্রতি তার আগ্রহ ছিল কি না, এ নিয়ে কিছু আলাপ দেখলাম, বা কেউ কেউ এ দিকে ইঙ্গিত করতে চেয়েছেন। আমি একে ভুল মনে করি। এটা সত্যি তার আগের কোন লেখাতে এমন বিষয় আসে নি, কিন্তু আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আমার সাথে তিনি অনেকবারই এমারাল্ড ট্যাবলেট নিয়ে আলাপ করেছেন। তার বাসগৃহ আগুনে পুড়ে না গেলে আমরা তার বইয়ের সংগ্রহ দেখতে পেতাম, এবং আমি নির্দ্বিধায় বলতে পারি সেই সংগ্রহের একটা বড় অংশ জুড়ে অকাল্ট, আলকেমি ও হার্মেটিসিজমের দুষ্প্রাপ্য বইগুলি ছিল।

কাপ্রিতে মৃত্যু প্রকাশিত হবার পরে যখন চারিদিকে এর প্রশংসা শুরু হলো, তখন এক অনুষ্ঠানে শেখ জামালউদ্দিন সাহেবের সাথে আমার দেখা হয়েছিল। ঐটাই তার সুস্থ থাকা অবস্থায় আমার সাথে শেষ দেখা। লেখক শেখ জামালউদ্দিন সাহেবের সাথে আমি কয়েকবছর এক সাথে কাজ করেছি, আমাদের মধ্যে সুসম্পর্ক বিদ্যমান ছিল। আমার কয়েকটি বই নিয়ে তিনি সমালোচনা প্রকাশও করেছিলেন।

শেখ জামালউদ্দিনের লেখক প্রতিভা অবশ্যই প্রশ্নের ঊর্ধ্বে, ও আমার পরিচয়ে আমি তার মধ্যে কোনরূপ অসততা লক্ষ্য করি নি। তার কাছ থেকে কোন অসৎ আচরণ পেয়েছেন কেউ এমন দাবিও আমি দেখি নি।

কাপ্রিতে মৃত্যু প্রকাশের পর জামালউদ্দিন ভাইয়ের উচ্ছ্বাস আমি লক্ষ্য করেছি। সেই উচ্ছ্বাসের মধ্যে কোন চালাকি বা অসততা রয়েছে আমার মনে হয় নি।

বিদ্যমান কাগজপত্র, ও অন্যসব স্বীকৃতি অনুযায়ী তিনিই কাপ্রিতে মৃত্যু বইটির লেখক। উপরন্তু, উপন্যাসের বিষয়বস্তু নিয়ে তিনি নানা সময়ে পত্রিকাতেও লিখেছেন, যে লেখাগুলি এখনো রয়েছে। ফলে, তিনি যে বইটির লেখক, এই দাবির পক্ষেই প্রমাণ বেশি। এবং আমি কখনোই বলছি না শেখ জামালউদ্দিনের এইরকম বই লেখার প্রতিভা নেই।

আমাকে দুইজন লেখক নিয়েই বলতে হচ্ছে, কারণ দুইজনের সাথেই আমি অনেক ভালো মুহূর্ত কাটিয়েছি, এবং আমার অত্যন্ত সৌভাগ্য যে তারা তাদের লেখালেখি ও চিন্তা নিয়ে অনেক কথা আমার সাথে আলোচনা করেছিলেন।

কাপ্রিতে মৃত্যু প্রকাশের এক বছর পরে যখন সাহিত্য সম্পাদক আনোয়ার ইমরান তার দাবি জানালেন যে বইটির লেখক আসলে হাসানুর রহমান, এবং প্রায় তিন বছর আগে হাসানুর রহমান পাণ্ডুলিপি তাদের কাছে পাঠিয়েছিলেন, কিন্তু প্রকাশের পূর্বমুহূর্তে প্রকাশ করতে নিষেধ করেছিলেন শেষ অধ্যায় বদলানোর কথা বলে, এই কথা জানার পর আমি নিজে গিয়ে আনোয়ার ইমরানের সংগ্রহে থাকা পাণ্ডুলিপি দেখে এসেছি। ইমরান সাহেবের সাথে এ নিয়ে বিস্তারিত কথা হয়েছে। তিনি মিথ্যে বলেছেন মনে হয় নি, এবং এখানে তার কোন স্বার্থ নেই।

এই সময়ে, বা অন্য কোন সময়ে শেখ জামালউদ্দিন ও হাসানুর রহমানের মধ্যে কোনরূপ দেখাসাক্ষাৎ, পত্র বিনিময় বা অন্য কোনরকম যোগাযোগ হয় নি, এটা প্রমাণ করে অনেকেই ইতিমধ্যে পত্রিকায় লিখেছেন প্রমাণসহ, ফলে এ নিয়ে আমি আর কিছু বলছি না।

এখন, বইটির লেখক আসলে কে, তা জানার সবচাইতে ভালো উপায় ছিল লেখক দুইজনের সাথে কথা বলা। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য যে, হাসানুর রহমান সাহেব অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা গেলেন (বা আত্মহত্যা করলেন) আর অন্যদিকে শেখ জামালউদ্দিন সাহেব হয়ে পড়লেন মানসিক ভারসাম্যহীন।

আমি এই দুইজন লেখককেই মহান লেখক মনে করি। তাদের পক্ষে অন্যের লেখা নিজের নামে চালিয়ে নেবার মত হীন কাজ অসম্ভব বলেই আমার বিশ্বাস। কিন্তু, যেহেতু আমরা এই সমস্যায় পড়ে গেছি যে, বইটি আসলে এদের মধ্যে কে লিখেছেন, এর সুরাহা নিয়মতান্ত্রিক উপায়েই করা দরকার। যুক্তি তর্ক প্রমাণ উপস্থাপন ইত্যাদি ভালো জিনিশ। কিন্তু মনে রাখতে হবে অনর্থক উল্লিখিত লেখকদের চরিত্রহানি যেন করা না হয়।

সমাপ্ত