১৭ জুলাই, ২০২৬
একবার দাঁড়াও বন্ধু
আমার বউ আমার সাথে কোনো কথাই বলে না আজ সাত দিন হল। এমন আর কখনও হয়নি আগে। আমরা প্রেম করে বিয়ে করেছিলাম। বাচ্চা-কাচ্চা এখনও হয় নি। আমি লেখক, আর আমার বউ চাকরি করে।
একজন লেখককে কিছু অদ্ভুত সমস্যার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, তা আপনি হয়তো জেনে থাকবেন। লেখা হচ্ছে একটা অন্য বাস্তবতা তৈরি করা, অন্য অনেক মানুষ ও তাদের জীবন। সেইসব বাস্তবতা যে নেই আসলে, তা কে বলবে? কারণ যা নেই তা কি মানুষ কল্পনা করতে পারে?
ফলে, আমি যা কল্পনা করি তার অস্তিত্ব যে নাই এ ব্যাপারে আমি কখনও নিশ্চিত না। আবার একেবারে আছে, এমন সিদ্ধান্তেও যেতে পারি না, কারণ তাকে তো ছুঁয়ে দেখা যায় না।
বাসার বেইজমেন্টে আমার পড়া ও লেখার ঘর। চারপাশে বইয়ের তাক, একটা ছোটো খাট, টেবিল চেয়ার, ল্যাপটপ। ছোটো ফ্রিজ ইত্যাদি।
বেশিরভাগ সময় আমি এখানে থাকি। কখনো-কখনো দিনরাত এখানে থাকি। কারণ হল যখন আপনি একটা গল্পের ভেতরে থাকেন তখন অন্য একটা বাস্তবতার ভেতরে থাকেন। অন্য অনেক মানুষের মধ্যে থাকেন, যাদের সকল কিছু নির্ভর করছে আপনার উপরে। এই অবস্থায় আপনি কখনও চাইবেন না আরও কোনো কিছু এসে আপনাকে বিরক্ত করুক।
আমার বউ ব্যাপারটা মেনে নিয়েছিল।
সে আমাকে ভালোবাসে, মানে আমার এমনই মনে হয়। আর আগেই বলেছি আমরা পরস্পরকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলাম।
আমি যে মহৎ সাহিত্যকর্ম করে যাচ্ছি, বা দুনিয়ার বড়ো সব লেখকদের মতো কাজ করে যেতে হবে আমার, এর জন্য আমার বউ আমাকে উৎসাহিত করত।
কিন্তু একটা পর্যায়ে আমার আলেকজান্ডার দ্যুমার একটা কথা মনে পড়ত বেশি। নারী তোমাকে দুনিয়ার সব শ্রেষ্ঠ কিছু পেতে অনুপ্রেরণা জোগাবে, আর সেটা যাতে তুমি অর্জন করতে না পার তার সকল ব্যবস্থা করে যাবে।
এই প্যারাডক্স যে কেবল নারীচরিত্রের সমস্যা আমি তা মনে করি না। আমার মনে হয় মানুষমাত্রই এমন সব প্যারাডক্সের নির্মাণ।
আমার বউ তার চাকরি-বাকরির কাজে, এবং আমি আমার লেখালেখির কাজে একটা সময় ব্যস্ত হয়ে পড়লাম বেশি। আর তখন আমাদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হতে শুরু করল বলে আমার মনে হয়।
যেমন, একদিন রাতে আমি খেতে গেছি। টেবিলে আমার স্ত্রী সরাসরি আমার দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা স্বরে জিজ্ঞেস করল, “শ্রাবন্তী কে?”
আমি অবাক হয়ে গেলাম এই প্রশ্নে। আমিও জিজ্ঞেস করলাম, “শ্রাবন্তী কে?”
এবং এরপরেই আমার মনে পড়ল শ্রাবন্তী কে।
এ নিয়ে আমাদের কথা কাটাকাটি হতে লাগল। আমি আমার বউকে বোঝাতে পারছিলাম না যে শ্রাবন্তী আমার লেখার একটা চরিত্র।
লেখার ড্রাফট দেখিয়েও আমি তাকে বিশ্বাস করাতে পারলাম না।
সে বলল, অনেকবার সে বেইজমেন্টে এসে দেখেছে আমি এই মেয়ের সাথে কথা বলছি।
তার কথা মিথ্যে নয়। আমি এরকম অনেক কথা বলেছি ওই মেয়ের সাথে। এবং সৎ ভাবে বলতে গেলে বলতে হয়, ওই মেয়ের প্রতি আমার বড়ো রকম দুর্বলতা তৈরি হয়েছে। কারণ সে ঠিক আমার মনের মতো। এটা কি আমার লেখার চরিত্র সেই জন্যে? কেবল লেখার চরিত্র হলে সে কীভাবে উঠে আসবে? এইভাবে হাসবে, আর আমার পাশে বসে আমারই লেখা নিয়ে এমন সব কথা বলবে যা আমি নিজেও কখনও ভাবিনি? এসব নিয়ে আমি নিজেও দ্বিধায় ছিলাম।
এর মধ্যে শুরু হল বউয়ের সাথে ঝামেলা।
এবং এক পর্যায়ে খুবই খারাপ হয়ে গেল পরিস্থিতি। আপনি হয়তো জানেন যারা পরস্পর প্রেম করে তারা পরস্পরের প্রতি হিংস্র হয়েও উঠতে পারে কেবল কিছু জিনিস বদলে গেলে। ফলে প্রেম কি আসলে নির্দিষ্ট কিছু শর্তসাপেক্ষের প্রেমময়তা, এবং সেগুলির অনুপস্থিতিতে বের হয়ে আসা হিংস্রতার উপরের হালকা আবরণ?
আমরা জিনিসপত্র ভাঙাভাঙি করলাম। আমার বউ একদিন কাচের প্লেট ভাঙল, আমি গ্লাস ভাঙলাম।
এরপর থেকে কথা বলাবলি বন্ধ ছিল।
এখনও সে আর আমার সাথে কথা বলছে না। আমাকে দেখলে তাকাচ্ছেও না। এমনভাবে বাস করছে যেন আমার অস্তিত্বই নেই। এবং আমার মনে হচ্ছে হয়তো আমি ওইদিন হিংস্রতা বেশি দেখিয়ে ফেলেছিলাম তাই, হঠাৎ আমি তার কাছাকাছি গেলে সে একরকম আমাকে ভয় পেয়ে দূরে চলে যাচ্ছে। সে কি ভাবছে আমি তার ক্ষতি করব?
আমার অস্বস্থি হচ্ছে। কারণ একটা মানুষ আপনাকে ঘৃণা করছে, বা আপনাকে সহ্য করতে পারছে না, বা ভয় করছে, এমন অনুভব ভালোলাগে না। তা ছাড়া সে আমার বউ, এবং আমরা ভালোবেসে বিয়ে করেছিলাম। সেই সময়ের অনেক স্মৃতি আমার মনে হতে লাগল। আমরা একসাথে হাতে হাত রেখে রিকশায় ঘুরেছি। কত জায়গায় গিয়েছি।
এইরকম মানসিক অবস্থায় লেখালেখি করা যায় না। আমার লেখা বন্ধ হয়ে গেল।
আমি নিঃসঙ্গ অনুভব করতে লাগলাম।
আমার অনেকদিন পর মনে হল বাইরে বের হই। বাইরের আলো হাওয়ায় হয়ত ভালোলাগবে।
রাস্তায় বের হলাম। চকচকা রোদ উঠেছে। নাম না জানা গাছের পাতাদের ফাঁক দিয়ে সে রোদ যখন পড়ছে, এক সুন্দর দৃশ্য তৈরি হচ্ছে সেখানে। আমার ভালোলাগলো।
কিছুদূর যাবার পেছনে আমি শুনলাম পেছন থেকে কেউ একজন গান গায়,
“একবার দাঁড়াও বন্ধু বহুদিনে ফাইছি তোমার লাগ দাঁড়াও নইলে প্রেম আগুনে করে দেব খাক একবার দাঁড়াও বন্ধু বহুদিনে ফাইছি তোমার লাগ…”
আমি পেছনে তাকিয়ে দেখলাম একজন লোক, যার মুখে সাদা দাড়ি, মাথায় লম্বা সাদা চুল, তিনি গলা ছেড়ে গান গাইতে গাইতে এগিয়ে আসছেন। এসে আমার কাঁধে হাত রাখলেন।
আমি তাঁর দিকে তাকিয়ে হাসলাম।
ভদ্রলোক গান থামিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “ঘুরতে বের হইছেন নাকি? সুন্দর দিন।”
আমি বললাম, “হ্যাঁ।”
ভদ্রলোক বললেন, “তাইলে চলেন ওইদিকে যাই, ওইদিকে একটা পার্ক আছে, পার্কে গিয়া বসি।”
আমি রাজি হলাম।
ভালোলাগছিল কথা বলার একজন সঙ্গী পেয়ে। কিছুদূর যাবার পরে একটা গলি দিয়ে ঢুকে পার্কের মতো জায়গায় গেলাম আমরা। গাছগাছালিতে ঘেরা শান্ত জায়গা। কয়েকটা বেঞ্চি পাতা। আমি সামনে তাকিয়ে বুঝলাম এটা খ্রিস্টানদের গোরস্থান, পার্ক না।
ভদ্রলোক বসতে বসতে বললেন, “পার্ক না আসলে, কিন্তু বসার জায়গা ভালো। আমি এইখানে আইসা মাঝে মাঝে বসি। আপনে সিগারেট খাইবেন?”
আমি বসে বললাম, “হ্যাঁ, খাওয়া যায়।”
আমরা দুইজনে সিগারেট ধরিয়ে গল্প করছিলাম।
ভদ্রলোক বললেন, “এইখানে আসলে মন নরম হয় বুঝলেন। কত কিছু যে দুনিয়ায় করছি, কত খারাপ কাজ, ভালো কাজ। সব মিলাইয়া মিশাইয়া একটা হিসাবের খেলা মাথায় আসে এইখানে আসলে। মনে হয় যেন অনেক কিছু না করলেও পারতাম।”
একটু থামলেন ভদ্রলোক। সিগারেটের ধোঁয়া ছেঁড়ে বললেন, “আপনারে দেখে মনে হইতেছে দুখী। কী দুঃখ আপনার?” আমি বললাম, “তেমন কিছু না। পারিবারিক কিছু সমস্যা যাচ্ছে।”
ভদ্রলোক আবার গলা ছেড়ে গাইলেন,
“এখটা খতা খইরে বন্ধু না খরিও রাগ এখটা খতা খইরে বন্ধু না খরিও রাগ আমায় ছেড়ে কাহার সনে এত ইতিবাক”
এরপর আমার দিকে তাকিয়ে সামান্য হেসে জিজ্ঞেস করলেন, “এইটাই কি আপনার সমস্যা?”
আমি বললাম, “না, ওইরকম না। আমার স্ত্রীরে আমি বিশ্বাস করি। সে এরকম কিছু করে না।”
ভদ্রলোক বললেন, “আমিও আপনার মতো ভাবতাম এক টাইমে। সেই দিন আর নাই।”
আমি বুঝতে পারলাম ভদ্রলোক তাঁর গল্প আমাকে বলতে চান। একজন লেখক হিসেবে আমি জানি এসব ক্ষেত্রে চুপ থাকতে হয়। তখনই ওই ব্যক্তি নিজে থেকেই তার গল্প বলতে শুরু করে। আর এখানে নিজে থেকে কিছু জিজ্ঞেস করে ফেললে সমস্যা হতে পারে। তখন ব্যক্তি মনে করতে পারে আপনি তার জীবন নিয়ে অহেতুক আগ্রহ দেখাচ্ছেন।
আমি চুপ করে রইলাম।
ভদ্রলোক বললেন, “অনেকদিন আগে আমি প্রেম করে বিয়ে করছিলাম। আমাদের মধ্যে অনেক প্রেম ছিল। আমাদের এক ছেলে হইল। এরপর একদিন আমি বাসায় গিয়া দেখি আমার ছেলে চেয়ারের সাথে বান্ধা অবস্থায় আছে। আর আমার বউ আমার বন্ধুর সাথে প্রেম করতে গেছে।”
আমার খারাপ লাগল এই কথা শুনে।
ভদ্রলোক পরিবেশ হালকা করতেই সম্ভবত হাসলেন, এবং গান ধরলেন আবার,
“কত নিশি গেল রে বন্ধু থাকিয়া সজাগ কত নিশি গেল রে বন্ধু থাকিয়া সজাগ এখন আমার আন্ধার ঘরে জ্বলে না চেরাগ”
তার গানের ভেতরে যে একটা দুঃখ আছে এটা আমি তখন প্রথম টের পেলাম।
ভদ্রলোক যখন গান থামালেন, এবং আমাকে আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলেন তখন খাকি পোশাক, হাফ প্যান্ট পরিহিত একটা লোক আমাদের সামনে দিয়ে যেতে যেতে গেয়ে উঠল,
“ওরে, রমিজ পাগল মরে যদি লইয়া প্রেমের আগ রমিজ পাগল মরে যদি লইয়া প্রেমের আগ শেষ বিচারে দেখাইব বুকের পুড়া দাগ।”
আমার পাশের ভদ্রলোক ওই লোকটাকে ডেকে বললেন, “আজকের পত্রিকাটা দিয়া যান।”
খাকি পোশাক পরিহিত লোক, পিছনে চটের ব্যাগ ঝোলানো, হাতে বর্শা। সে এগিয়ে এসে তার চটের ব্যাগ থেকে একটা পত্রিকা বের করে দিল। আর বলল, “গান গাইতেছিলেন আপনারা। শেষ দুই লাইন গাইয়া দিলাম। মার্জনা করবেন।”
আমার সাথের ভদ্রলোক বললেন, “আরে না না, কোনো সমস্যা নাই। আমরা গান নিয়াই আলাপ করতেছিলাম।”
খাকি পোশাকধারী লোকটা আমার দিকে তাকাল। তাকিয়ে হেসে বলল, “আপনে তো নতুন। আমাদের আগে সাক্ষাৎ হয় নাই। আমি রানার। এখন যাইতে হবে, পিক টাইম। সবার পত্রিকা দরকার। আবার দেখা হবে অন্যসময়।”
লোকটা প্রায় দৌড়েই চলে গেল।
আমার পাশের লোকটি পত্রিকা খুলেছিলেন। একটা খবর দেখে আমি চমকে উঠলাম।
ভদ্রলোক আমার চমকানো টের পেয়েছিলেন।
আমার দিকে পত্রিকাটি বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, “দেখেন, কীভাবে আপনার স্ত্রী আপনারে খুন করে লাশ সরাইয়া ফেলছে তার বিত্তান্ত। এই ঘটনায় অনুসন্ধানী রিপোর্ট পর্ব আকারে প্রকাশ হইতেছে আমাদের পত্রিকায়। দুনিয়ার মানুষ কিছুই জানে না। হয়তো জানতেই পারবে না কখনও যে আপনার কী হইছিল।”
সমাপ্ত