১৭ জুলাই, ২০২৬
আলী ও কাঠবিড়ালী
এক
শাফাকাত আলী অনেক আগে গ্রাম ছেড়েছিলেন। এখন ষাটোর্ধ্ব বয়সে তিনি আবার গ্রামে ফিরলেন। না ফিরে উপায় ছিল না। শহুরে দুনিয়ার অবস্থা ভালো না। যুদ্ধ যুদ্ধ পরিস্থিতি চারিদিকে। বিশ্ব পরিস্থিতিও খারাপ, একেক দেশ তাদের মানববিধ্বংসী অস্ত্র নিয়ে উন্মত্ত শিং উঁচানো ষাঁড়ের মতো লাফাচ্ছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন আরেকটা বড় যুদ্ধ এবার হবেই।
শাফাকাত আলী ভয়ে ফিরে এসেছেন প্রত্যন্ত গ্রামে এমন ভাবার কোনো কারণ নেই। ভয়ে তিনি আসেননি। এসেছেন সামাজিক ও পারিবারিক অমানবিকতায় ক্ষুব্ধ হয়ে। তার পুত্র কন্যা সবাই বিদেশ পাড়ি জমিয়েছে। শহুরে সমাজের কারো সাথে সত্যিকার আন্তরিক কোনো সম্পর্কও শাফাকাত আলী গড়ে তুলতে পারেননি। তাই তিনি শেষ বয়সে নিজের গ্রামেই ফিরে এলেন। এখন থেকে এখানেই থাকবেন।
শহুরে অস্থিরতা থেকে সবুজ প্রাকৃতিক আচ্ছাদনে আবৃত গ্রামখানি প্রায় মুক্তই বলা যায়। শাফাকাত আলীর পৈতৃক বাড়ি দেখাশোনা করতো মজিদ মিয়া। আলী সাহেবের আগমনে সে বিশেষ খুশি হলো।
গ্রামে এসে কয়েকদিনের মধ্যেই শাফাকাত আলী কাজে লেগে পড়লেন। বাড়ির সামনের জায়গাটায় তিনি বাগান করবেন ঠিক করলেন। সেই অনুযায়ী বীজ সংগ্রহ, রোপণ, মাটি তৈরি ইত্যাদি কাজে লাগলেন তিনি। এইসব কাজ টাজের মধ্যেই কাঠবিড়ালিদের তার নজরে পড়ে, অনেক অনেক দিন পর। পুকুরে হাত ধুতে গিয়ে নারিকেল গাছে তিনি দেখতে পান দশ বিশটা কাঠবিড়ালি, অবাক বিস্ময়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে। প্রথমে আলী সাহেব একটু হকচকিয়ে গিয়েছিলেন। এতগুলো প্রাণী অবাক হয়ে, চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে দেখলে হকচকিয়ে যাওয়াটা স্বাভাবিকই।
আলী সাহেব মজিদ মিয়াকে ডেকে বললেন, ও, মজিদ! এত কাঠবিড়ালি কেন এইখানে?
মজিদ হেসে বলল, স্যার, এইগুলা এইখানেই থাকে। কোনো ঝামেলা করে না, নির্বিবাদে।
সেই কথাবার্তার মধ্যেই দেখা গেলো চটের বস্তা হাতে একটা লোক পুকুরের পাড়ে পাড়ে হাঁটছে। মুখ দিয়ে শিস দেয়ার মতো অদ্ভুত শব্দ করছে। তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি পুকুরের পাড়ে থাকা নারিকেল গাছদের মাথার দিকে।
আলী সাহেব মজিদ মিয়াকে জিজ্ঞেস করলেন, এই লোকটা কে? কী করে?
মজিদ মিয়া বলল, ইনি জসিম সদাগর। গ্রামে সবে তুকতাক কবিরাজ বইলা ডাকে। কী করেন তার নাই ঠিক।
আলী সাহেব নামটা শুনে লোকটার মুখের দিকে খেয়াল করলেন। এবং তিনি তাকে চিনতে পারলেন। আলী সাহেবের বাল্য বন্ধু জসিম সদাগর। এইভাবে অনেকদিন পরে জসিম সদাগর ও কাঠবিড়ালিদের সাথে শাফাকাত আলীর দেখা হয়েছিল। তিনি তখন ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেননি এদের সাথে এই সাক্ষাতের পরবর্তী সময়ে কী এক জটিল অবস্থার ভেতর দিয়ে তাকে যেতে হবে।
দুই
জসিম সদাগর ও শাফাকাত আলীর সেদিন কথাবার্তা হলো বেশ। শাফাকাত আলী লক্ষ্য করলেন তার বন্ধুটি বেশ অন্যমনস্ক, সেই আগের দুরন্তপনার কিছুমাত্র আর অবশিষ্ট নেই তার মাঝে।
গ্রামের রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে তারা কথা বলছিলেন। একসময় বিরাট এক বট গাছের সামনে এসে জসিম সদাগর বললেন, এইখানে আমি ক্ষান্ত দিব আলী। এইটা আমার সাধনার স্থল। এই জাগা কি চিনতে পারো, বন্ধু আমার?
শাফাকাত আলী বললেন, না। মনে পড়ছে না।
জসিম সদাগর বললেন, এইটা সেই জাগা, যেইখানে আমার দাদা ধনু কবিরাজ ওলা বিবিরে বর্শা দিয়া গাঁইথা থুইছিলেন। এইটা বড় পুণ্যের গাছ। এই বিরিক্ষই আমাদের বাঁচাবে, নিদানের কালে।
জসিম সদাগর গিয়ে গাছের নিচে বসলেন।
তিন
গ্রামের অন্যান্যদের সাথে কথা বলে আলী সাহেব বুঝলেন জসিম সদাগরের মাথা অল্প বিগড়ে গেছে, এটা সকলেই মানে। তিনি মেট্রিক পর্যন্ত পড়েছিলেন। তারপর পড়ালেখা ছেড়ে দিয়ে বনে বাদাড়ে ঘুরে বেড়াতে থাকেন। কিছুদিন নিরুদ্দেশ ছিলেন, চলে গিয়েছিলেন এক তান্ত্রিকের আস্তানায়। গ্রামে এমন কথা প্রচলিত আছে কামরূপ কামাক্ষ্যা থেকে অনেক মারাত্মক সব যাদু শিখে এসেছেন জসিম সদাগর। তাই সবাই তাকে সমীহ করে চলে, ভয় পায়।
গ্রামের পথে ঘাটে, বনে জঙ্গলে জসিম সদাগর যখন ঘুরে বেড়ান তখন তিনি পছন্দ করেন না কেউ তার পিছু লাগুক বা দেখুক তিনি কী করছেন। প্রথম প্রথম না জেনে অনেকে আগ্রহী হয়েছিল। কিন্তু জসিম সদাগরের বান মারার হুংকার শুনে দ্বিতীয়বার তার কর্মকাণ্ড দেখার ইচ্ছা কারো কখনো হয়নি। তাই লোকেরা আসলে জানে না গ্রামে ঘুরে ঘুরে জসিম সদাগর আসলে কী করেন।
চার
কয়েকদিন গেল আরো। আলী সাহেব বাগান গুছিয়ে এনেছেন। দিনে বেশ পরিশ্রম হয়। তাই রাত্রে ঘুম হয় ভালো। সে রাত্রে আলী সাহেব গভীর ঘুমের মধ্যেই ছিলেন। আকাশে উঠেছিল বড় এক চাঁদ। সেই চাঁদের রুপালি আলোতে দেখা গেল কিছু ছোট ছোট জীব খুব গম্ভীর পায়ে হেঁটে হেঁটে চলে গেলো শাফাকাত আলী সাহেবের বাড়িতে। আলী সাহেবের ঘরের দরজা অদ্ভুত এক ক্যাচ ক্যাচ শব্দ করতে করতে খুলে গেল। জীবেরা সুশৃঙ্খল ভাবে হেঁটে আলী সাহেবের ঘরের খোলা দরজা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল।
আলী সাহেব শব্দটি শুনতে পেয়েছিলেন, এবং তিনি দেখছিলেন ব্যাখ্যাতীত এক ভয়ঙ্কর স্বপ্ন। তিনি ঘেমে উঠেন, তার ঘুম ভেঙে যায়। ঘুম ভেঙে তিনি যা দেখতে পান তা তার স্বপ্নের মতোই অবাস্তব। তিনি দেখলেন খোলা দরজা দিয়ে কটকটে চাঁদের আলো এসে ঘরে প্রবেশ করছে, এবং দরজার মুখে দাঁড়িয়ে আছে পাঁচটি প্রাণী।
পাঁচটি কাঠবিড়ালি।
গম্ভীরভাবে একটি আগে। বাকি চারটি পেছনে।
শাফাকাত আলীর গলা শুকিয়ে গেলো ভয়ে। তিনি চিৎকার করার চেষ্টা করে দেখলেন গলা থেকে কোনো শব্দ বের হচ্ছে না। কেবল গো গো জাতীয় একটি শব্দ তৈরি হচ্ছে।
শাফাকাত আলী দেখলেন সামনে থাকা কাঠবিড়ালিটি শান্ত এবং ধীর পায়ে এগিয়ে আসলো। ভাঙা এবং খসখসে গলায় সে কথা বললো, যেন একজন অতিবৃদ্ধ লোক কথা বলছে।
কাঠবিড়ালিটি বলল, ভয় পেয়ো না শাফাকাত। ভয় পেয়ো না। আমরা তোমায় মারবো না, কোনো ক্ষতি করবো না। সে ক্ষমতাও আমাদের নেই অবশ্য। ভয় পেয়ো না।
শাফাকাত আলী কিছু একটা বলার চেষ্টা করলেন। কিন্তু তার মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হলো না।
কাঠবিড়ালিটি বলল, শান্ত হও শাফাকাত। আমাদের এই হঠাৎ আগমনে তুমি সন্ত্রস্ত হয়ে উঠেছো। তাই কথা বলতে পারছো না। শান্ত হও শাফাকাত।
কাঠবিড়ালিটি বলল, তুমি হয়তো আমাদের চিনতে পারবে না শাফাকাত। কিন্তু আমরা তোমাকে চিনি। বেশ ভালোভাবেই চিনি। এই ঘরে তোমার মা যেদিন বউ হয়ে এলো সেদিনও আমরা ছিলাম। সেই উৎসবের দিন, আজো মনে পড়ে আমাদের।
কাঠবিড়ালিটি বলতে থাকলো, আর যেদিন তুমি ঐ পুকুরে পড়ে গিয়েছিলে, তোমার তখন ছ সাত বছর বয়স, মনে কি পড়ে শাফাকাত?
শাফাকাত আলী মনে করার চেষ্টা করতে লাগলেন। হ্যাঁ, একবার তিনি ছোটকালে ঐ পুকুরে পড়ে গিয়েছিলেন। সব স্মৃতি মনে নেই, বেশ আবছা আবছা ভাবে মনে পড়ছে ঐ দিন কেউ একজন দ্রুত পানিতে নেমে তাকে উদ্ধার করেছিল। প্রচুর পানি খেয়েছিলেন তিনি। জ্বর হয়েছিল ঠান্ডায়। কিন্তু প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন।
এই পুকুরকে অনেকে বলতো দোষী পুকুর। নানা ধরনের কথা এই পুকুর নিয়ে প্রচলিত ছিল। বিভিন্ন সময়ে বাড়ির তিন চারজন বাচ্চা এই পুকুরে ডুবে মারা গিয়েছিল। ফলে শাফাকাত আলীর বেঁচে আসা এক সৌভাগ্যের লক্ষণ বলে ধরে নিয়েছিলো সবাই। লোকে বলতো, দেওলা নিয়ে গিয়েছিল কিন্তু ধরে রাখতে পারেনি। কোনো এক অজ্ঞাত কারণে শাফাকাত আলীকে ধরে রাখতে পারেনি দেওলা, জলের নিচে, খুব গভীরে থাকা অলৌকিক অস্তিত্ব বিশেষ। সেই কারণটি কী জানা না থাকায় বাড়ির লোকেরা শাফাকাত সাহেবকে ভিন্ন চোখে দেখতেন, মনে করতেন কোনো গোপন ক্ষমতা আছে তার মধ্যে।
শাফাকাত আলীর এইসব মনে পড়লো কাঠবিড়ালিটির কথায়। কাঠবিড়ালি বলতে থাকলো, শাফাকাত, সেইদিন তুমি ডুবে মরতে। কখনো কি ভেবে দেখেছো কেন তুমি বেঁচে ফিরেছিলে? হয়তো ভাবোনি। তোমরা মানুষেরা বড় অস্থির শাফাকাত আলী। তোমরা অনেক কিছুই ধীরে সুস্থে ভেবে দেখো না। যদি ভাবতে তাহলে বুঝতে পারতে আমরাই বাঁচিয়ে ছিলাম তোমাকে। আমরা তোমাকে ডুবতে দেখে চিৎকার করতে থাকি। আমাদের চিৎকার শুনেই একজন লোক এগিয়ে আসেন। তিনি এসে দেখতে পান পুকুরে তুমি হাবুডুবু খাচ্ছো। তিনি পানিতে নেমে পড়েন ও তোমাকে উঠিয়ে আনেন।
শাফাকাত আলী এতক্ষণে একটু স্থির হয়েছেন। তার ভয়ার্ত ভাবটা কমেছে। তিনি অনেক কষ্টেই বলতে পারলেন, আপনারা...আপনারা এখানে কী চান?
কাঠবিড়ালি বলল, হ্যাঁ, আমরা চাইতেই এসেছি। আমরা তোমার কাছে আমাদের জীবন চাইতে এসেছি। একদিন আমরা তোমার জীবন বাঁচিয়ে ছিলাম। এখন সময় এসেছে তোমার সেই ঋণ শোধ করার। তুমি আমাদের জীবন বাঁচাও শাফাকাত। আমরা বিপন্ন।
শাফাকাত আলী শুষ্ক কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, কীভাবে? আমাকে কী করতে হবে?
বৃদ্ধ কাঠবিড়ালি বলল, তান্ত্রিক যাদুকর জসিম সদাগর আমাদের ধরে ধরে খুন করছে। ভাতের সাথে বিষ মিশিয়ে সে নারিকেল গাছে রেখে দেয়। সাধারণ কাঠবিড়ালিরা তা খেয়ে মারা যায়। এভাবে সে আমাদের সমূলে বিনাশ করতে চায়।
শাফাকাত আলী জিজ্ঞেস করলেন, কেন?
কাঠবিড়ালিটি বলল, সে ডাকিনী বিদ্যার অনুশীলন করে। আমাদের রক্ত তার দরকার হয় তন্ত্র মন্ত্র ও আনুষঙ্গিক কাজের সময়। এবং সে আমাদের মনে করে তার কালো যাদু বিদ্যার বিরুদ্ধ শক্তি হিসেবে। তুমি তার হাত থেকে আমাদের বাঁচাও শাফাকাত।
শাফাকাত আলী কী বলবেন ভেবে পেলেন না। কাঠবিড়ালিটি বলল, বিদায় শাফাকাত। আমরা আজ চলে যাচ্ছি। কিন্তু আবার আসবো।
কাঠবিড়ালিটি ঘুরে আবার অন্যদিকে সবার আগে চলে গেল। বাকিরা তার পিছনে। এইভাবে তারা নির্দিষ্ট ছন্দে হেঁটে হেঁটে চলে যেতে লাগলো উজ্জ্বল চাঁদের আলোতে। বিছানার উপরে বসা শাফাকাত আলী। তিনি বিশ্বাস করতে পারছেন না কী হলো তার সামনে।
পাঁচ
পরদিন শাফাকাত আলী ঠিক করলেন কাঠবিড়ালিদের বাঁচাতে হবে। তিনি জসিম সদাগরের সাথে দেখা করতে পুরনো বটগাছের কাছে গেলেন, কিন্তু তাকে পেলেন না।
মজিদ মিয়াকে নিয়ে তিনি পুকুর পাড়ের নারিকেল গাছগুলি পরীক্ষা করে বিষ মাখানো ভাত পেলেন। এগুলো ফেলে দেয়া হলো।
সন্ধ্যায় লাল টকটকে চোখ নিয়ে হাজির হলেন জসিম সদাগর। তিনি আলী সাহেবের বাড়িতে এসে রাগান্বিত ভাবেই শাফাকাত আলীকে বলতে লাগলেন, এইসব কী শাফাকাত? তুমি নাকি আমার ভাতগুলা সরাই ফেলছো গাছ থেকে?
আলী সাহেব নরম সুরে বললেন, দেখো জসিম, কাঠবিড়ালিগুলো এতে খামকা মারা যায়। ওরা আছে, থাকুক না। ক্ষতি তো করছে না আমাদের।
গর্জে উঠেন জসিম সদাগর, ক্ষতি করছে না মানে? কী কইতে চাও তুমি? কাঠবিড়ালিদের কী জানো তুমি মিয়া? এরা আমাদের শত্রু। এদের জন্য দুনিয়া আজ ধ্বংসের পথে।
আলী সাহেব অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, এদের জন্য দুনিয়া ধ্বংসের পথে কীভাবে?
জসিম সদাগর রাগত গলায় বলেন, এরা সাধারণ জীব না। কালো যাদুর জগত থিকা টপকে আসা অশুভ আত্মা। এরা নিরন্তর আমাদের বিরুদ্ধে কাজ করে। আমাদের ধ্বংসের জন্য সব আয়োজন এরাই করে। আমার তন্ত্রবিদ্যা এদের শেষ করার নিমিত্তে। আমি এদের ধ্বংস কইরাই ছাড়বো।
আলী সাহেব বুঝতে পারলেন জসিম সদাগরের মাথা কাজ করছে না, এর সাথে কথা বলে লাভ নেই। তিনি বললেন, আচ্ছা, ঠিক আছে ভাই। তুমি শান্ত হও।
জসিম সদাগর বিরক্তির সাথে বললেন, ধুর মিয়া! রাখো তোমার শান্ত হওয়াহওয়ি। আমার কাজে হাত দিবা না। প্রথমবার তাই কিছু কইলাম না। পরের বার আর হাত আস্ত থাকবো না। এই জসিম, ধনু কবরেজের নাতি, জবান কিলিয়ার।
আলী সাহেব এই কথায় সামান্য রেগে গেলেন। প্রায় সারাজীবনই বড় পদে চাকরি করেছেন। অনেক ঘাগু লোক এসে তার কাছে ধর্না দিয়েছে নানা কাজে। কারণে অকারণে তিনি কখনো কখনো তাদের ঘুরিয়েছেন। কিন্তু এই সাধারণ এক কবিরাজ তার সামনে এমন অহংকার দেখায়! আলী সাহেব বললেন, মুখ সামলে কথা বলো জসিম। তুমি আমার বাল্যবন্ধু, তাই আমি সহ্য করছি তোমাকে। এখান থেকে মানে মানে কেটে পড়ো। আর এখন থেকে একটা কাঠবিড়ালিও তুমি মারতে পারবে না। দরকার পড়লে নারকেল গাছ পাহারা দেবার জন্য আমি লোক রাখবো আরো।
জসিম সদাগর এমন কথা প্রত্যাশা করেননি শাফাকাত আলীর কাছ থেকে। তিনি ভেবেছিলেন হয়তো অন্যদের মতো শাফাকাত আলীও ভয় পাবেন তার কথায়। কিছুটা অবাক হয়েই জসিম সদাগর কিছুক্ষণ দেখলেন শাফাকাত আলীকে, তার লাল লাল দুই চোখ মেলে। অতঃপর উগ্র কণ্ঠে বললেন, বুঝতে পারছি আমি কী হইছে এখানে। শত্রুরা খেইড় খেলাইতেছে।
গাছের দিকে এগিয়ে গিয়ে চিৎকার দিয়ে বললেন জসিম সদাগর, তোদের খেলা আমি ধইরা ফেলছিরে। দিন তোদের শেষ। এইবার হবে আসল খেলা।
কয়েকটা লাফ দিয়ে, উঠানে দ্রুত তিনটা চক্কর দিয়ে জসিম সদাগর চলে গেলেন।
ছয়
ঐদিন রাতে আবার এলো কাঠবিড়ালিরা শাফাকাত আলীর কক্ষে। তারা প্রথমে ধন্যবাদ জানালো তাকে। এরপর বুড়ো কাঠবিড়ালিটি বলল, কিন্তু বিপদ শেষ হয়নি শাফাকাত। কালো যাদুকরটি বুঝে গিয়েছে আমরাই তোমার সাথে কথা বলেছি। এবার সে অন্য পন্থা নিবে।
শাফাকাত আলী তাদের আশ্বস্ত করলেন। সাধারণ এক কবিরাজ তার সাথে পেরে উঠবে না। দরকার হলে তিনি প্রশাসনের সহায়তা নিবেন জানালেন।
কয়েকদিন এইমত চললো। জসিম সদাগরের দেখা নেই। কাঠবিড়ালিও আসে না শাফাকাত আলীর কক্ষে।
প্রায় চারদিন পরে শাফাকাত আলী সকালে ঘুম থেকে উঠে তার দরজার সামনে একটি মৃত কাঠবিড়ালি দেখতে পান। ঐদিনই আবার দেখা গেল জসিম সদাগরকে গ্রামের বাজারে। তিনি উন্মত্ত কণ্ঠে বলে বেড়াচ্ছিলেন, বইন্যা হবে রে, বইন্যা হবে। তলাইয়া যাবে, দেশ ভাইস্যা যাবে। দুইন্যা ভাইস্যা যাবে। সব ভাইস্যা যাবে রে মনা।
এই বলে বলে তিনি লোক জড়ো করলেন। তারপর গম্ভীর কণ্ঠে তার ভাষণ দিলেন, বন্ধুগণ, আপনারা আমারে চিনেন, জানেন। আমি ধনু কবরেজের নাতি, যেই ধনু কবরেজ ওলা বিবিরে গাঁইথা রাখছিলেন বটগাছের সাথে। আমি সেই লোক, যে কামরূপের সব যাদু বিদ্যা গিইল্যা খাইছি। আমি একাধারে দেশ বিদেশ এবং দূর অন্তরীক্ষ পর্যন্ত সবখানে ছড়াইয়া থাকা জ্ঞাত অজ্ঞাত সব জিনিসরে রাখি নিজের অন্তরে। আমার তন্ত্র মন্ত্র বিদ্যা আমারে দিছে সেই জ্ঞান। এই জ্ঞান অর্জনে লাগে বড় সাধনা, মহাশয়েরা।
সাধারণত জসিম সদাগর বেশি কথা বলেন না। ফলে হঠাৎ করে তার এই ভাষণ লোকেরা উৎসাহী হয়ে শুনতে থাকলো।
জসিম সদাগর বলতে থাকলেন, বন্ধুগণ, এই কয়দিন আমি ছিলাম না অত্র অঞ্চলে। আমি গিয়াছিলাম বহুদূরে, সুদূরে। আমি গিয়াছিলাম পাহাড়ে, পর্বতে, নদীতে, দূর হিমালয়ে। সেই সবের বাতাসে কী কানাকানি হয়, কী গোপন সংবাদের বার্তা বইয়া যায় তা আমি জানছি এইবার।
বন্ধুগণ, বড়ই খারাপ সংবাদ আমাদের দুইন্যার জন্য। বড়ই দুঃসংবাদ। বড় এক বইন্যা হবে, বান ডাকবে বান। আসমান থিকা ঝরবে খালি পানি আর পানি। সেই বৃষ্টিধারায় সব যাবে ভাইস্যা। প্লাবন হবে ভাইয়েরা, হবে আরেক মহাপ্লাবন।
আর এই সময়ে আপনারা যদি বাঁচতে চান, তাহলে আসেন, আমার সাথে আসেন। আমি নৌকা বানাবো। বড় এক নৌকা। যে বটগাছটায় আমার দাদা ধনু কবরেজ ওলা বিবিরে গাঁইথা থুইছিলেন ঐ গাছের কাঠ দিয়াই আমি নৌকা বানাবো। আপনারা বাঁচতে চাইলে আমার সাথে আসেন।
এইসব কথা বলতে থাকলেন জসিম সদাগর।
সাত
কাঠবিড়ালির মৃতদেহ পাওয়ায় শাফাকাত আলীর মনে শান্তি ছিল না। তিনি ভেবে পেলেন না কীভাবে এই মৃতদেহ তার দরজার সামনে এলো।
উত্তর মিললো ঐদিন রাতে। সে রাতে আবার কাঠবিড়ালিরা শাফাকাত আলীর কক্ষে দেখা দিল। শাফাকাত আলী জেগেই ছিলেন, তার মন বলছিলো আজ ওরা আসবে।
কাঠবিড়ালিগুলো এসেছিল মৃত এক কাঠবিড়ালির শরীর নিয়ে। সামনে মৃতদেহ নামিয়ে রেখে শান্তভাবে বুড়ো কাঠবিড়ালিটি বলল, শাফাকাত, আমরা এভাবেই মারা পড়ছি। যাদুকর কবিরাজ আমাদের ছাড়বে না। সে আমাদের তীর্থস্থান প্রাচীন বটগাছটি কেটে ফেলার পরিকল্পনা করেছে। ওটা কেটে ফেললে আমরা আমাদের সব কিছু হারাবো। ওখানেই আমাদের অস্তিত্বে সবচাইতে বড় অংশ রয়েছে।
শাফাকাত আলী বললেন, আপনারা ভাববেন না। জসিম ওই গাছ কাটতে পারবে না। এটা গ্রামের সম্পত্তি।
কাঠবিড়ালিটি বলল, সাধারণ কেউ হলে পারতো না শাফাকাত। কিন্তু ও সাধারণ কেউ নয়। ওর সাথে আছে কালো যাদুবিদ্যা। তুমি আমাদের বাঁচাতে চাইলে গাছটিকে বাঁচাও।
কাঠবিড়ালিগুলো আর বেশি কথা বললো না। মৃতদেহটি নিয়ে আস্তে আস্তে চলে গেল।
সে রাতে অনেক ভাবলেন শাফাকাত আলী। কীভাবে কী করা যায়, পুলিশের সাহায্য নেয়া কি উচিত হবে, নাকি গ্রামের লোকদের তিনি বুঝাবেন?
আট
জসিম সদাগর সবখানেই তার নৌকার গল্প বলে বেড়িয়েছেন। কিছু কিছু লোক এই গল্প বিশ্বাসও করেছে। বটগাছটি কাটার জন্য করাত টরাত সহ লোকজন নিয়ে এসেছেন জসিম সদাগর এমন দেখলেন শাফাকাত আলী। জসিম সদাগর কারো অনুমতির তোয়াক্কা করছেন না।
শাফাকাত আলী গ্রামের পঞ্চায়েত প্রধানের কাছে গেলেন। ভদ্রলোক বয়স্ক লোক, হাসানুজ্জামান ইদ্রিস তার নাম। হাসানুজ্জামান সহ গ্রামের অন্যান্য মুরুব্বিরা আলী সাহেবের অনুরোধে একবার বুঝাতে গেলেন জসিম সদাগরকে। কিন্তু জসিম সদাগর বুঝার পাত্র নন। তিনি পারলে তেড়ে আসেন এমন অবস্থার তৈরি হলো।
তিনি শাফাকাত আলীকে উদ্দেশ্য করে বললেন, যা তুই যা। শালা, তুই একটা বিভীষণ। আমার চক্ষের সামনে থিকা দূর হ। নাইলে তোরে জুতাবো।
নিজের পায়ে জুতা ছিলো না। জসিম সদাগর জুতাবো বলে তাই অন্যদের পায়ে জুতা খুঁজতে লাগলেন। আলী সাহেব অবস্থা বেগতিক দেখে সরে আসলেন বাড়িতে।
পুলিশকে বলেও কোনো কাজ হবে না বুঝলেন আলী সাহেব। কারণ থানা জেলা সদরে। সেখানকার পুলিশ এই উদ্ভট সমস্যায় নাক গলাতে চাইবে না।
আলী সাহেব পড়লেন মহা সমস্যায়।
গাছ কাটা শুরু হলো। যেদিন গাছে করাত লাগলো সেদিন সকালে আলী সাহেব তার দরজার সামনে পেলেন পাঁচটি কাঠবিড়ালির মৃতদেহ। সে রাতে তার কক্ষে বুড়ো কাঠবিড়ালি এসে আবার সাহায্য প্রার্থনা করে গেল।
প্রাচীন বটগাছটি এত বড় যে কাটতে কিছুদিন লাগবে। যারা কাটছে তাদের হাতে যেহেতু উন্নত যন্ত্রপাতি তেমন নেই তাই সময় বেশি লাগা স্বাভাবিক।
আলী সাহেব বুঝতে পারলেন যে করেই হোক গাছ কাটা তার বন্ধ করতেই হবে। কাঠবিড়ালির প্রসঙ্গ বাদ দিলেও পরিবেশগত কারণ রয়েছে। তাছাড়া এই উন্মাদ কর্ম কিছুতেই মেনে নেয়া যায় না।
অনেক ভেবেচিন্তে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন কোনোভাবে জসিম সদাগরকে বুঝানো যায় কি না দেখবেন। শেষ চেষ্টা করে দেখবেন তিনি। এতে না হলে সোজা সদরে চলে যাবেন। পরিবেশ রক্ষা আইনে মামলা করবেন।
ওই রাতে জসিম সদাগরের বাড়িতে যেতে তার যে হালকা ভয় হয়নি এমন নয়। যাদু বিদ্যায় তিনি বিশ্বাস করেন না। জসিম সদাগরের বানোয়াট গল্পে তিনি বিশ্বাস করেন না। যে দাদার গল্প জসিম সদাগর করে বেড়ায় সে লোককে ছোটবেলায় খেতে কাজ করতে পর্যন্ত দেখেছেন আলী সাহেব।
কিন্তু, বিশ্বাস না করলেও নিরাপত্তা নিয়ে চলা আবশ্যক মনে করেন শাফাকাত আলী। তাই তার পুরনো পিস্তলটি তিনি পকেটে নিয়েই জসিম সদাগরের বাড়ির দিকে হাঁটা শুরু করলেন।
জসিম সদাগরের বাড়িকে বাড়ি বললে বাড়িরা লজ্জা পেতে পারে। ভাঙা মাটির দেয়াল, উপরে ছনের ছাউনিসহ কোনোমতে টিকে আছে এক স্তূপ আবর্জনা সদৃশ। এর ভিতরে কীভাবে কোনো মানুষ থাকতে পারে আলী সাহেব কল্পনা করতে পারলেন না।
তিনি বাইরের দরজায় কয়েকটা ঠুকা দিয়ে ডাকলেন, জসিম, ও জসিম!
কোনো শব্দ এলো না। দরজার ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে প্রদীপের আলো। অর্থাৎ, ভেতরে আলো জ্বলছে। শাফাকাত আলী আরো কয়েকবার ডাকলেন। কিন্তু কোনো সাড়া এলো না।
অগত্যা তিনি দরজায় হালকা ধাক্কা দিলেন। তাতেই দরজাটি খুলে গেল।
শাফাকাত আলী দেখলেন ঘরের মাঝখানে বেদীর মতো জায়গা। সেখানে একটি ভিনদেশি চেহারার মূর্তি। তার সামনে কেটে রাখা হয়েছে কয়েকটি কাঠবিড়ালি, কিছু লাল জবা ফুল। শাফাকাত আলী একটু এগিয়ে গিয়ে দেখলেন মূর্তিটির সামনে একটি শাদা পাত্রে রাখা আছে লাল রক্ত। মূর্তিটির মুখেও লেগে আছে রক্ত।
আলী সাহেবের গা কেমন যেন ছমছম করে উঠল। তিনি পকেটে হাত দিয়ে পিস্তলটা ধরে ঠিক করলেন এখনই ফিরে যাবেন বাড়িতে। এইরকম কাজ করছে যে লোক, সে আরো ভয়ঙ্কর কাজ করে ফেলতে পারে।
শাফাকাত আলী ঘুরে দাঁড়াবেন এমন সময় বিকট হাসির শব্দে তিনি চমকে উঠলেন। দেখলেন দরজার একদিকে লম্বা রামদা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন জসিম সদাগর। তার পরনে একটি জরির পোশাক। প্রদীপের আলোতে চকচক করছে।
আলী সাহেব কিছু বুঝে উঠার আগেই জসিম সদাগর ঝাঁপিয়ে পড়লেন তার উপর। উন্মত্ত রামদার আঘাত থেকে অল্পের জন্য রক্ষা পেলেন আলী। কিন্তু তিনি বুঝতে পারছিলেন মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচার একটা মাত্র উপায়ই আছে তার কাছে। তিনি আক্রমণোদ্যত ক্ষুব্ধ পিশাচ চেহারার জসিম সদাগরের দিকে তার পিস্তল তাক করে গুলি করলেন। দু’টি গুলি।
নয়
জসিম সদাগরের মৃত্যুর খবর গ্রামে জানাজানি হলো পরদিন। লোকেরা মনে করলো প্রাচীন বটগাছের অভিশাপে এই মৃত্যু। যারা গাছ কাটতে এসেছিল তারা পালালো।
প্রত্যন্ত গ্রামে জসিম সদাগরের মতো এক কবিরাজের মৃত্যু নিয়ে থানা পুলিশ আর হলো না। একদিনেই কাহিনী শেষ।
উপরন্তু, বিরাট বটগাছটি অর্জন করলো গ্রামবাসীর ভয়মিশ্রিত সমীহ।
আলী সাহেব প্রথমদিকে একটু ভয়ে ভয়ে ছিলেন। কিন্তু সন্ধ্যার দিকে তার ভয় কেটে যায়।
ঐ রাতে তিনি দরজা খুলে দিয়ে কাঠবিড়ালিদের জন্য অপেক্ষায় ছিলেন। কিন্তু তারা এলো না।
পরদিন সকাল থেকে শুরু হয় আকাশ ভেঙে বৃষ্টি। শাফাকাত আলী বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাইরে গাছের পাতায় পাতায় পড়তে থাকা বৃষ্টিধারা দেখছিলেন। সতর্ক দৃষ্টিতে দেখতে চেষ্টা করছিলেন নারিকেল গাছে থাকা কাঠবিড়ালিরা বের হয়েছে কি না। এইসময়ে মজিদ মিয়া এসে বলল, স্যার, দেখেন অকালে কীরকম মেঘ বৃষ্টি! আইজ কি ভুনা খিচুড়ি করবো?
শাফাকাত আলী অকালে পড়ন্ত বৃষ্টিধারা দেখতে দেখতে, মেঘগর্জন শুনতে শুনতে ভাবছিলেন এই বৃষ্টি যদি আর বন্ধ না হয়, যদি জসিম সদাগরের কথাগুলি সত্যি হয়ে থাকে, তাহলে কী হবে?
তার ভাবনায় ছেদ পড়লো কয়েকটি কাঠবিড়ালি দেখে। এরা নারিকেল গাছ থেকে নেমে এসেছে শাফাকাত আলী সাহেবের বাড়ির উঠানে। উঠানের দূর্বাঘাসের স্তরের উপর লাফাচ্ছে তারা। অকালের বৃষ্টিতে কাঠবিড়ালিদের আনন্দ হয় শাফাকাত আলীর জানা ছিল না। তিনি ভ্রু কুঁচকে, সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে তাদের দেখতে থাকলেন।
সমাপ্ত