সব গল্প

২৫ জুলাই, ২০২৬

আকাশী ম্যাডাম

রাত বারোটা আটাশ মিনিট এবং আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম নগরীর জিন্দাবাজার এলাকায় একটি অর্ধ নির্মিত, ভগ্ন দশাগ্রস্ত চেহারার বহুতল ভবনের পাশে। তখন বৃষ্টি নামল আকাশ ভেঙ্গে। বড় বড় ফোঁটায় নামল ঝমঝম করে। আমি দৌড়ে গিয়ে বিল্ডিংটার বারান্দায় আশ্রয় নিলাম।

শহর যেন থেমে গেছে আমার মনে হলো।

বৃষ্টির বড় ফোঁটাগুলিকে আমি রাস্তায় পড়তে দেখছিলাম। ছোটবেলা থেকেই আমার মনে হয় প্রতিটি বৃষ্টির ফোঁটা মানুষকে স্পর্শ করার জন্যই আসমান থেকে লাফ দেয়। এর মাত্র ক্ষুদ্র একটি অংশ তাদের উদ্দেশ্যে সফল হয়। আর বাকীরা স্থলে পড়ে, জলে পড়ে।

সেদিনও বৃষ্টি দেখে আমি এমন ভাবছিলাম। একজন মহিলা বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে দৌড়ে এসে বারান্দায় উঠলেন। পান খাচ্ছিলেন তিনি। আমার দিকে তাকিয়ে একটু থমকে দাঁড়ালেন যেন।

তারপর একপাশে বসে পড়লেন। আমি দেখলাম তার হাতে কারুকাজ খচিত বহু সুন্দর একটি ধাতব বাক্স।

তার বয়স চল্লিশের উপরে আমার মনে হলো।

ভদ্রমহিলা আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “বাবা, আপনার নাম কি হয়?”

আমি বললাম, “হামিদ।”

ভদ্রমহিলা বললেন, “এই রাতে, বৃষ্টির মধ্যে, এতদঞ্চলে আপনি কী করেন?”

আমি বললাম, “আমি এদিক দিয়েই যাচ্ছিলাম, হঠাৎ বৃষ্টি আসল তাই আশ্রয় নিলাম এখানে।”

ভদ্রমহিলা বললেন, “কিন্তু আপনি জানেন তো এইসব খুব একটা ভালো এলাকা না? বিশেষত রাত্রি বারোটার পরে?”

আমি বললাম, “এদিকে আমি খুব একটা আসি নি রাতে। কিন্তু আমার তো মনে হয় না এলাকা খুব খারাপ।”

ভদ্রমহিলা হাসলেন। আমি তার পান খাওয়া দাঁত দেখলাম।

আমি তার হাতের কারুকার্যময় ধাতব বাক্সটিকে দেখছিলাম। ঠিক যেন প্রাচীন কালের রাজাদের জিনিসের মত। এমন জিনিসে আমার আগ্রহ অত্যধিক।

আমি বললাম, “আপনার বাক্সটি খুব সুন্দর। এটা কোথা থেকে কিনেছেন?”

ভদ্রমহিলা আবারো মৃদু হাসলেন। বললেন, “এটা কোন সাধারণ বাক্স নয়। এটা দিয়ে আমি এক অদ্ভুত কাজ করে থাকি।”

আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কী কাজ?”

ভদ্রমহিলা বাক্সটি ঘুরিয়ে অন্যপাশ থেকে কী একটা চাবি দিলেন। আমি দেখলাম একটা আঙুল প্রবেশ করানোর মত ফাঁক তৈরী হয়েছে।

ভদ্রমহিলা বললেন, “ফাঁক দেখতে পাচ্ছেন বাবা?”

আমি বললাম, “জি।”

তিনি বললেন, “আমি শহরে ঘুরে বেড়াই শনি মঙ্গলবারে। কোন একলা মানুষ পেলে তাকে গিয়ে বলি, এই আমার জাদুর বাক্স, আপনি মধ্যাঙ্গুল ঢুকিয়ে যা চাইবেন, তাই পাবেন।”

“তারপর?”

“অনেকেই বিশ্বাস করে এবং আঙ্গুল ঢুকায়। তখন আমি অন্যদিক থেকে চাবি চেপে দেই। ধাতব ধারালো ব্লেড নেমে কেটে দেয় আঙ্গুল। কট করে শব্দ হয়।”

ভদ্রমহিলা হাসি হাসি মুখে কথাটি বললেন। আমার বিশ্বাস হলো না।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, “আঙুল কাটেন কেন?”

ভদ্রমহিলা স্বাভাবিক কন্ঠে বললেন, “দরকার আছে বাবা। কাজে লাগে। আমাদের মত যারা আছে তাদের কাটা আঙুল দরকার হয়। এবং আঙুল আহরণের এই সবচেয়ে সিদ্ধ পদ্বতি।”

হালকা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, “তবে এখন আর কেউ আমার মত বাক্স দিয়ে আঙুল সংগ্রহ করে বেড়ায় না, শনি মঙ্গলবারে ব্যস্ত জনপদে বের হয় না।”

আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, “কেন?”

ভদ্রমহিলা বললেন, “এভাবে আঙুল সংগ্রহ অনেক ঝুঁকিপূর্ন। তাই অন্য সহজ উপায় থাকতে এটা কেন বেছে নেবে ওরা? জাহাজভাঙা কারখানাগুলিতে ওরা ঘুরঘুর করে। দারোয়ান, দালাল ইত্যাদি কর্মচারীদের সাথে যোগাযোগ রাখে। প্রায়ই তো ওখানে শ্রমিকদের আঙুল বা পুরো হাত পা কাটা যায়। আঙুল সংগ্রহ তাই খুব একটা কঠিন কাজ না এখন।”

আমি বললাম, “আচ্ছা, আমাকে বাক্স খুলে দেখান তো। দেখি ভিতরে কী আছে!”

ভদ্রমহিলার মুখে সাময়িক বিব্রত ভাব দেখলাম।

কিন্তু তিনি বাক্স খুললেন। আমি দেখলাম তাতে খুব সুন্দরভাবে পান সাজানো।

আমি বিজয়ী ভঙ্গিতে ভদ্রমহিলার দিকে তাকিয়ে বললাম, “আঙ্গুল কোথায়?”

তিনি বললেন, “আজ বৃহস্পতিবার, আজ আঙ্গুল কাটার নিয়ম নেই।”

ভদ্রমহিলা বাক্সটি বন্ধ করে রাস্তার দিকে তাকালেন। আমি পাশ থেকে তাকে দেখছিলাম। দেখতে দেখতে আমার মনে হলো এই মহিলাকে আমি চিনি। ইনি আকাশী ম্যাডাম।

অনেক আগে আমি বিদ্যাসুন্দর প্রাইমারী স্কুলে পড়তাম। আমাদের স্কুল ছিল গ্রামে, গ্রাম ছিল পাহাড়ের পাদদেশে।

আকাশী ম্যাডাম আমাদের ইতিহাস পড়াতেন। তিনি গল্পের মত করে পড়াতেন। সবার প্রিয় ছিলেন তিনি।

একবার শীতের সময়, গ্রাম্য মেলার পরদিন তাকে আর পাওয়া যায় না। চারিদিকে তাকে খুজতে লোক বের হয়, কিন্তু তাকে পাওয়া যায় না। তিনি হারিয়ে যান। পরস্পরে জানা যায় মেলার দিন তাকে মেলাতে আসা বৃদ্ধ যাদুকরের সাথে দেখা গিয়েছিল। লোকেরা ধারণা করল তিনি এই যাদুকরের সাথেই চলে গেছেন বা যাদুকর কোনভাবে তাকে নিয়ে গেছে। যাদুকরদের অসীম ক্ষমতা। কেবলমাত্র ঈশ্বরই তাদের চাইতে বেশী ক্ষমতা রাখেন বলে জনশ্রুতি আছে।

আমার সব মনে পড়ে গেল।

ভদ্রমহিলা বা আকাশী ম্যাডাম মুখ ঘুরিয়ে বললেন, “চিনতে পেরেছো হামিদ?”

আমি বললাম, “জি ম্যাডাম। কিন্তু আপনাকে এতদিন পর এভাবে দেখব ভাবি নি। আপনি কেমন আছেন? কোথায় ছিলেন এতদিন?”

ম্যাডাম বললেন, “সে অনেক কথা। তোমাকে প্রথম দেখেই আমি চিনতে পেরেছিলাম। তাই নাম জিজ্ঞেস করে নিশ্চিত হই। তুমি খুব ভালো ছাত্র ছিলে। স্কুলটা কি এখনো আছে?”

আমি বললাম, “জি না ম্যাডাম। স্কুলটা ভেঙ্গে গেছে। মানুষেরা শহরে আসতে শুরু করল। ওখানে পড়ার মত কেউ ছিল না। তাই একা একাই স্কুলটি দাঁড়িয়ে ছিল, কোন রকম পরিচর্যা ছাড়াই। হাওয়া-বাতাস, জল-পানি, পোকামাকড় সব মিলে নিঃশেষ করে দিয়েছে। এখন গেলে দেখা যায় বিরান ভূমি।”

ম্যাডাম একটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, “আমাকে এমনই বলেছিল যাদুকর। তার ভবিষ্যতবানী মিথ্যে হয় নি।”

আমি প্রশ্ন করলাম, “এজন্যই কি ম্যাডাম আপনি আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন?”

আকাশী ম্যাডাম কোন উত্তর দিলেন না। তিনি নিশ্চুপ হয়ে রইলেন। বৃষ্টি থেমে এসেছে।

আকাশী ম্যাডাম বললেন, “চলো, আমার বাসা থেকে চা খেয়ে যাবে। অনেক অনেক দিন পর তোমার সাথে দেখা হলো, প্রিয় ছাত্র আমার।”

আমার ইচ্ছা ছিল না যাওয়ার কারণ রাত অনেক হয়েছে। একটু ইতস্তত করছিলাম।

ম্যাডাম বললেন, “কাছেই বাসা। কুয়ার পাড়, হদু খা লেনের ভেতরে, একেবারে শেষমাথায় গিয়ে ডানে তিন হাত।”

আমি জায়গাটা ঠিক চিনতাম না, বিশেষত হদু খা লেন। কিন্তু ম্যাডামের কথায় না করতে পারলাম না।

ম্যাডাম হেঁটে চললেন, আমি তার পিছু পিছু। আমরা বৃষ্টির পানিযুক্ত রাজপথের উপর দিয়ে হাঁটলাম। আমরা অল্প কাদা মাড়িয়ে চললাম।

একটা সরু গলির সামনে দাঁড়িয়ে ম্যাডাম বললেন, “এটাই হদু খা লেন। এদিকে এসেছ আগে?” আমি বললাম, “না।”

ম্যাডাম এগিয়ে যেতে যেতে বললেন, “রাত অনেক হয়েছে। তোমাকে এভাবে চা খাওয়ানোর জন্য নিয়ে আসা হয়ত ঠিক হয় নি। কিন্তু কী করবো বলো, তোমাকে দেখে আমার অতীতের অনেক কথা মনে পড়ে গেল।”

আমি বললাম, “সমস্যা নেই ম্যাডাম।”

ম্যাডাম বললেন, “অল্প সময় লাগবে। তবে তুমি পরে বাসায় যেতে পারবে তো একা?”

উত্তরে বললাম, “জি ম্যাডাম, এ ব্যাপারে আপনি কোন চিন্তা করবেন না।”

সরু গলিটাতে প্যাচপ্যাচে কাদা এবং গর্ত স্থানে স্থানে। এগুলির উপর দিয়ে হেঁটেই আমি ও ম্যাডাম একেবারে শেষমাথায় চলে এলাম। ম্যাডাম ডানে ঘুরে কয়েক পা গেলেন। একটা ছোট ঘরের সামনে তিনি দাঁড়ালেন।

ঘরটাকে দেখে আমার ভয় ধরে গেল।

নিঃসঙ্গ ভুতুরে একটা ঘর যেন। টিনের চাল, মাটির দেয়াল। এর সমস্ত চেহারায় ভৌতিক কিছু একটা ছিল বা অন্ধকারের জন্য এরকম মনে হচ্ছিল আমার।

ম্যাডাম বললেন, “এ আমার আবাস হামিদ, এসো ভেতরে এসো!”

তিনি দরোজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করলেন। তার পিছু পিছু আমি।

ভিতরে প্রবেশ করে আমি দেখলাম পুরনো জিনিসপত্রে ঘরটি ঠাঁসা। অনেক আগেকার টিনের ড্রাম, বেতের ঝুড়ি, একপাশে স্তুপাকারে রাখা বহু পুরনো কাগজ, একটি ছোট খাট এবং তাতে জরাজীর্ণ চেহারার মশারী।

ম্যাডাম বললেন, “তুমি এখানে বসো, আমি চা করে আনছি।”

ম্যাডাম একটি ছোট দরজা দিয়ে, ঘাড় নিচু করে আরেক কক্ষে চলে গেলেন।

আমি ছোট ঘরটির চারপাশ দেখছিলাম, আর এর অবস্থা দেখে অবাক হয়ে যাচ্ছিলাম। এমন অবস্থায় কোন মানুষের বসবাস সম্ভব না আমার মনে হল। মাকড়শাল জাল ছেয়ে আছে ঘরটিতে।

দেখতে দেখতে আমি টেবিলটাকে দেখলাম। একপাশে রাখা টেবিল। ঘরের অন্য সব বস্তুর চাইতে এ জায়গাটি তুলনামূলক পরিচ্ছন্ন। এগিয়ে গিয়ে দেখলাম টেবিলে ধাতব বাক্সের স্তুপ। কারুকার্যময় ধাতব বাক্স সব, যেমনটি ম্যাডামের হাতে দেখেছিলাম।

আমি একটি বাক্স হাতে নেই, এবং কৌতুহল বশত খুলে ফেলি।

ভিতরে দেখতে পাই মানুষের মধ্যাঙ্গুল। পঞ্চাশটি তো হবেই। এক ধরনের তরলে রাখা হয়েছে, তাই দেখতে সজীব। আমার মাথা ঘুরে যায়।

অন্য বাক্সগুলোর দিকে চোখ যায়। আমি দ্রুত ঘুরে দরজাটির দিকে তাকাই যেদিকে ম্যাডাম চলে গেছেন। সেই কক্ষ থেকে ঠুকঠাক শব্দ আসছে।

এক তীব্র ভয় আমাকে ঘিরে ধরে এবং ভেতর থেকে আমি পালানোর তাগিদ অনুভব করি। নিজেকে যতটুকু পারা যায় সামলে, কোন চিৎকার না করে, প্রায় দৌড়ে আমি মূল দরজার কাছে যাই।

কিন্তু দরজা বন্ধ।

আমি মৃদু ধাক্কা দেই খোলার জন্য, খুলতে পারি না।

আমি জোরে ধাক্কা দেই খোলার জন্য, তবুও দরজা খুলে না।

আমার সারা শরীর ঘেমে যায়।

আমি শুনতে পাই পেছন থেকে ম্যাডামের কন্ঠ, “বাবা হামিদ, চা খেয়ে যাও।”

সমাপ্ত